করোনায় পাল্টেছে জীবন, বাউল শিল্পী এখন চানাচুর কারখানার শ্রমিক

200

সৌরভ রায়, গঙ্গারামপুর : একসময় তাঁর গান শুনতে হাজারো মানুষের ভিড় উপচে পড়ত। তাঁর সুরে একাত্ম হয়ে যেতেন শ্রোতারা। গঙ্গারামপুরের শংকর দাস বাউলের গানের অনুষ্ঠান থাকলে তাতে দূরদূরান্ত থেকে অনেকে হাজির হতেন। তবে সেই সুদিন আর নেই। করোনা আবহে অনুষ্ঠান বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করতে হয়েছে বিখ্যাত বাউলশিল্পীকে। সংসার চালাতে স্থানীয় একটি চানাচুর কারখানায় শ্রমিকের কাজ করছেন। যে হাতে একতারা, দোতারার মতো বাদ্যয়ন্ত্র শোভা পেত, সেই হাত দিয়ে এখন চানাচুর ভাজতে হয়।  সেইসঙ্গে করতে হয় প্যাকেজিংয়ের কাজও। সারাদিন কাজ করে রোজগার হয় মাত্র ২৫০ টাকা। নিজের শিল্পীসত্ত্বা বিসর্জন দিয়ে শ্রমিকের কাজ করতে মন চায় না। তবুও ভুখা পেটে তো আর গলা চলে না। তাই বাধ্য হয়ে পেশা বদল করতে হয়েছে গানপাগল কার্তিক দাসকে।

শংকর দাস বাউলের বাড়ি গঙ্গারামপুর ব্লকের কালীতলায়। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি টান। পরবর্তীতে বাউল গানকেই বেছে নিয়েছিলেন পেশা হিসাবে। একতারা, দোতারা, খমক-সম্বল বলতে এটুকুই। মঞ্চে রাতের পরে রাত গানের অনুষ্ঠান করতে করতেই বয়স এখন প্রায় ষাটের কাছাকাছি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সংসারে এখন একমাত্র সঙ্গী স্ত্রী। রাজ্য সরকারের লোকপ্রসার প্রকল্পের ভাতা পান মাসে এক হাজার টাকা। কিন্তু মাঝপথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় করোনা। গত দুই মাস ধরে লকডাউনের কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে সরকারি ও বেসরকারি সমস্ত অনুষ্ঠান। উত্তরবঙ্গের বেশ কয়েক জায়গায় বাউল উৎসবের বায়না ছিল। অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বায়নার টাকা ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।

- Advertisement -

বাউলের আসর ছাড়া অন্য কোনও আয়ের পথ নিয়ে এতদিন ভাবনা আসেনি মাথায়। শংকরবাবু আক্ষেপের সঙ্গে বলেন, দুবেলা খাবার জোগাড় করতে নতুন করে কাজে ঢুকতেই হল। যার সঙ্গে এত দিনের কাজের কোনও মিল নেই। চানাচুর শ্রমিকের কাজ নিয়েছেন বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে। বেলডবাড়িতে একটি সংস্থায় চানাচুর ভাজেন। নিজেই চানাচুর প্যাকেটে ভরেন।  চানাচুর ভাজতে ভাজতে মন খারাপ হলে কারখানার ভেতরেই একতারা হাতে শুরু করে দেন গান। করোনা নিয়ে রাজ্য সরকারের উদ্যোগে সচেতনতামূলক গান গেয়েছেন জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি আধিকারিকের নির্দেশে। শিল্পীর স্ত্রী কাজলি দাস বাউল স্বামীর পোশাক, বাদ্যযন্ত্র সব গুছিয়ে রেখেছেন। তিনি বলেন, দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে সঞ্চয় আর কিছু নেই। অভাবের কথা বলব কাকে। ইচ্ছা থাকলেও স্বামীর সঙ্গে লোকপ্রসার প্রকল্পের ভাতা জোগাড় করতে পারেননি।  তবে একদিন সবকিছু স্বাভাবিক হবে। আবার আগের মতোই প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠবে গোটা পৃথিবী। আবার তিনি একতারা হাতে মঞ্চে বাউল গান গেয়ে শ্রোতাদের মাতিয়ে তুলবেন। এই আশাতেই দিন গুনছেন বাউলশিল্পী শংকর দাস।