সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আলো খুঁজে বেড়াক বাংলা

124

কাজী কামাল নাসের : আমার পরম সৌভাগ্য, জন্মেছিলাম এমন এক নিম্নমধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমান পরিবারে, যেখানে ধর্মীয় গোঁড়ামির তীব্র আস্ফালন ছিল না। বরং এক উদার মানবিকতার সুবাতাসে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার অফুরান অবকাশ ছিল। এই পরিবেশটুকু গড়ে দেওয়ার যাবতীয় কৃতিত্ব আমার বাবা-মা দুজনের। বছরে দুদিন ইদের নমাজে শামিল হওয়া ছাড়া বাবাকে অন্য ধর্মীয় আচার পালন করতে দেখিনি। মা নিয়মিত নমাজ-রোজা পালন করতেন। কিন্তু প্রকৃত ধর্মাচারী মানুষের মতোই কোনও সাংঘাতিক গোঁড়ামি তাঁকে কখনও পেয়ে বসেনি।

আমার শৈশব কেটেছে খিদিরপুরের এমন এলাকায়, যেখানে সব ধর্মের মানুষের সহাবস্থান ছিল। খুব নিয়মিত না হলেও মাঝেমধ্যেই ধর্মীয় কারণে নানা সংঘাত হত! আমি কেমন করে যেন বুঝতে শিখেছিলাম, চারপাশে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-শিখ-বৌদ্ধ সব ধর্মের মানুষ মিলেমিশে থাকলেও হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কে এক বৈরিতার চোরাস্রোত খেলা করে। মনে পড়ে, ছোটবেলায় স্কুলে সরস্বতীপুজোয় প্রথমবার ঠাকুরের প্রসাদ মুখে তোলার মুহূর্তে একটা অপরাধবোধ কাজ করেছিল। ঔচিত্য-অনৌচিত্যের দ্বন্দ্ব সেদিন দীর্ণ করেছিল আমায়। বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে সেকথা স্বীকার করলে মায়ে প্রশ্রয়বাণী আমার সব দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসান ঘটায়। স্কুলে পড়ার সময় ক্লাসে চল্লিশজনের মধ্যে আমরা বোধহয় দুজন মাত্র মুসলমান ছাত্র ছিলাম। বাকি সবাই হিন্দু। কিন্তু ভাবতে গর্ব হয়, সমগ্র ছাত্রজীবনে আমাদের ধর্ম কোনদিনও বন্ধুত্বের অন্তরায় হয়নি। আমার শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের সিংহভাগ সময়টাই কেটেছে বাঙালি হিন্দু সমাজের সঙ্গ ও সাহচর্যে। আমার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সুখকর। তবে হ্যাঁ, এরই মধ্যে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষজন যে একেবারে দেখিনি, তা নয়। আমার এক বিশিষ্ট কবি বন্ধু কামালুজ্জামানকে হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার জন্য এই কলকাতা শহরে বাড়ি ভাড়া নিতে গিয়ে কতবার চূড়ান্ত হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে, তা বলতেও লজ্জা করে।

- Advertisement -

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির শিকড় যদি সত্যিই ততটা গভীরে প্রোথিত থাকত, তাহলে আমার বাবার মতো প্রগতিচিন্তার মানুষকেও শেষ বয়সে নিজের বাড়ি করার সময় মেটিয়াবুরুজ বটতলা এলাকাকেই বেছে নিতে হত না! এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে বহুবার মতানৈক্যজনিত তর্কবিতর্কে জড়িয়েছি। এ বিষয়ে তাঁর উদ্বেগমিশ্রিত কৈফিয়ত ছিল, সারাজীবনের কষ্টার্জিত সঞ্চয় দিয়ে আমাদের জন্য একটা মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দিয়ে যাবেন। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি এমন দিন আসে যে আমাদের ওই বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়, তাহলে তার চেয়ে মর্মবেদনার আর কী থাকতে পারে? বিশেষ করে সম্প্রতি ভারতের এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল যেভাবে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাতে এতদিনের সাম্প্রদাযিক সম্প্রীতির ধারণাও প্রতিদিন ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বৈকি! গত কয়েক বছরের মধ্যে মানুষের মন খুব দ্রুত বদলাতে দেখছি। একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। ফিরহাদ হাকিম যেদিন কলকাতার মেয়র হলেন, ঠিক তার পর দিন বাসে আমার দুই বয়স্ক সহয়াত্রীর মধ্যে এই কথোপকথন চমকে দিয়েছিল। একজন অন্যজনকে বললেন, দেখেছ, দিদির কাণ্ড দেখেছ? অন্যজন সবিস্ময় তাকাতে তিনি বলে ওঠেন, বাপের জন্মে এমন ঘটনা দেখেছ? কলকাতার মতো জায়গায় এক মুসলমানকে মেয়র করে দিল! তিনি যদি বলতেন, নারদে টাকা নিতে দেখা এমন একজন বাজে মানুষকে বসিয়েছে, তার একটা মানে বুঝতাম! কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের হলেও এটাই সত্যি যে, হীন রাজনীতির শিকার মানুষ এখন বোধহয় মানুষকে হিন্দু অথবা মুসলমান হিসেবেই দেখতে শিখছে। ফলে আগামীটা আমার মতো মানুষের পক্ষে খুব একটা স্বস্তিদায়ক হচ্ছে না, বেশ বুঝতে পারছি।

তবে এই নেতিবাচক জায়গায় লেখাটা শেষ করতে চাই না। হপ্তাখানেক আগে আমার এক ছাত্রী আমাকে জানালেন, তিনি তাঁর শয্যাগত শাশুড়ির পরিচর্যার জন্য এক মুসলমান তরুণীকে অনেক কষ্টে জোগাড় করেছেন। তিনি খুব সন্দিহান ছিলেন, শাশুড়ি তাঁর হাতের সেবা নেবেন কি না! কিন্তু সেদিন তিনি খুবই নিশ্চিন্তির সঙ্গে জানালেন, তাঁর শাশুড়ি সেই তরুণীর হাতের সমস্ত সেবাই গ্রহণ করছেন, তাঁর হাতে খাচ্ছেনও। ঘটনাটা তুচ্ছ, কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে আছে আশার আলো। প্রশ্নটা হল, আমরা সেই আলোটা দেখতে পাচ্ছি কি? বলা ভালো, দেখতে চাইছি কি?

(লেখক গায়ক ও সাহিত্যিক)