পেশা সাফাই, নেশা কোচিং-কঠিন স্বপ্নের যুদ্ধে ভবানী

121

সমীর দাস, কালচিনি : সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কোনি সিনেমাটা দেখেননি ভবানী। কিন্তু কালচিনির মাঠে দাঁড়িয়ে যখন এলাকার প্রতিভাবান ছেলেমেয়েদের ফুটবল খেলার প্রশিক্ষণ দেন তিনি, নিজের মতো করেই দাঁতে দাঁত চেপে বারবার বলতে থাকেন ফাইট চালিয়ে যাওয়ার কথা।

এই ফাইটই করে আসছেন তিনি সেই ছোটবেলা থেকেই। কালচিনি থেকে সামান্য দূরে আটিয়াবাড়ি চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তান ভবানী মুন্ডা ছোটবেলায় ফাইট করেছেন নিজের স্বপ্নপূরণের জন্য। ফুটবলকে নিজের প্যাশন বানিয়েছেন। কিন্তু জীবিকার সমাধান হয়নি তাতে। স্বপ্ন ছাড়তে হয়েছে মাঝপথে। এখন তিনি কালচিনি হিন্দি হাইস্কুলের সাফাইকর্মী। মাসমাইনে ১,৪০০ টাকা। স্কুলের সামনেই একটি ঝুপড়ি চায়ের দোকান রয়েছে। স্বামী দশরথ কুজুরের সঙ্গে মিলে সেটা চালান। আর বাকি সময়টায় চা বলয়ের কিশোর-কিশোরীদের নিয়মিত ফুটবল প্রশিক্ষণ দেন ভবানী। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। তাঁর হাতেগড়া মহিলা ফুটবলারদের অনেকেই রাজ্যস্তরে খেলেছেন। অনেকে আবার খেলার সুবাদেই চাকরিও পেয়ে গিয়েছেন। চা বলয়ের মহিলাদের মধ্যে খেলাধুলোয় প্রসার ঘটানোয় ভবানীর যে অবদান, তারই স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গরত্ন পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।

- Advertisement -

বঙ্গরত্ন ভবানী একসময় নিজে একজন কৃতী মহিলা ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন। এখন সেই স্বপ্নপূরণ করেন এলাকার মেয়েদের মধ্যে প্রতিভা খুঁজে বের করে। তাঁর একটাই আক্ষেপ, এই কাজে রাজ্য সরকারের তরফে বা বেসরকারি কোনও সংস্থার তরফে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়নি কেউ। ফুটবলের প্রশিক্ষণ দিতে গেলে প্রয়োজন নিয়মিত পুষ্টিকর খাদ্যের। এছাড়াও ফুটবল খেলার জার্সি, বুট কেনা থেকে শুরু করে অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা অনেকটাই ব্যয়বহুল। এসবের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই ভবানীর কাছে। কিন্তু তাও চা বলয় থেকে প্রতিভা তুলে আনার লক্ষ্যে অবিচল থেকে কিশোর-কিশোরীদের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছেন ভবানী।

অনেকটা আক্ষেপের সুরে ভবানী বলেন, চা বাগানে প্রতিভার অভাব নেই। কিন্তু প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালানোর অনেক সমস্যা রয়েছে। তাও এত কষ্ট করে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি শুধুমাত্র চা বলয়ের প্রতিভাকে সামনে তুলে আনতে। কেউ পাশে দাঁড়ালে খুব উপকার হয়।

কালচিনি থেকে সামান্য দূরে আটিয়াবাড়ি চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তান ভবানী। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলোর প্রতি আকর্ষণ ছিল তাঁর। বাড়ির অমতেই এক দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। এরপর তাঁর খেলার প্রতি টান আরও বেড়ে যায়।

চা বলয়ের শ্রমিক পরিবারের এক কিশোরী, ছেলেদের মতো হাফপ্যান্ট পরে মাঠে একাই ফুটবল নিয়ে কসরত করছে, সেই সময়ে নিরিখে তা বড় সামান্য কথা নয়। অনেকেই ব্যঙ্গ করতেন। সেসবে পাত্তা না দিয়ে ফুটবলকে আঁকড়ে ধরেন তিনি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক কারণে একসময় তাঁর বড় ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্নে ইতি পড়ে যায়। এরপর শুরু হয় প্রতিভা তুলে আনার সংগ্রাম। তৈরি করেন কালচিনি ডুয়ার্স মহিলা ফুটবল ক্লাব। চা বাগানের কিশোর-কিশোরীদের ফুটবল খেলায় উৎসাহিত করতে শুরু করেন তিনি। ওই ক্লাবের মাধ্যমেই নিঃশুল্ক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন ভবানী। ওই ফুটবল ক্লাবের মাধ্যমে বর্তমানে চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের প্রায় ৫০ জন কিশোর-কিশোরীকে তিনি প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

ভবানী বলেন, ২০১৬ সালে আলিপুরদুয়ারের তৎকালীন বিধায়ক সৌরভ চক্রবর্তী সরকারি অনুষ্ঠানে আমার হাতে বঙ্গরত্ন সম্মান তুলে দিয়েছিলেন। আমার কয়েকজন ছাত্রী রাজ্য মহিলা ফুটবল দলের হয়ে আন্দামানে ফুটবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। কেউ কেউ খেলার জোরে সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরিও পেয়েছে। ভবানীর পাশে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গে কালচিনির বিডিও প্রশান্ত বর্মন বলেন, ভবানী লিখিত আবেদন জানালে জেলা প্রশাসন ও যুব কল্যাণ দপ্তরে জানাব।