মালদা জেলায় ১৫০ কোটি বিড়ি ফ্যাক্টরিতে নষ্ট হচ্ছে

তনয় মিশ্র, মোথাবাড়ি : লকডাউনে এই মুহূর্তে মালদা জেলার বিভিন্ন বিড়ি ফ্যাক্টরিতে প্রায় ১৫০ কোটি বিড়ি মজুত হয়ে পড়ে রয়েছে। বিড়ি মালিকদের আশঙ্কা, আর কিছুদিন এই বিড়ি মজুত অবস্থায় পড়ে থাকলে সেগুলি নষ্ট হয়ে যাবে। এই বিড়ি বাজারজাত না করা পর্যন্ত কোনও বিড়ি কোম্পানির মালিক বিড়ি তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আগামীদিনে কালিয়াচকের তিনটি ব্লক সহ মালদা জেলার চার লক্ষাধিক বিড়ি শ্রমিক চরম সংকটের মধ্যে পড়তে চলেছেন। প্রশ্নের মুখে পড়তে চলেছে তাঁদের জীবিকা।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রামবাংলায় বিড়ি শ্রমিকদের সমস্যার কথা ভেবে এই শিল্পের উপর থেকে লকডাউন শিথিল করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতে মজুত থাকা বিড়ি বাজারজাত না করা গেলে সমস্যার সমাধান হবে না বলে বিড়ি শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য। মালদা জেলার বিড়ি শ্রমিক সংগঠনগুলি প্রয়োজনে বিভিন্ন রাজ্যের বিড়ি সংগঠন ও মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে। বিড়ি শ্রমিক সংগঠন ও মালিকদের অভিযোগ, লকডাউন হওয়ার পর থেকে তাঁরা কোনও বিড়ি বাজারজাত করতে পারেননি। এর ফলে বিভিন্ন কোম্পানিতে তিন থেকে চার কোটি করে বিড়ি মজুত হয়ে রয়েছে। মালদা জেলায় প্রায় ৬০টি বিড়ি ফ্যাক্টরি আছে। সব মিলিয়ে ফ্যাক্টরিগুলিতে মজুত বিড়ির পরিমাণ ১৫০ কোটির বেশি। এই জেলার বিড়ি শুধু এই রাজ্য নয়, অসম, দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের বাজারেও যায়। লকডাউন শিথিল না করা হলে এই বিপুল পরিমাণ বিড়ি কোম্পানিতে মজুত থেকে নষ্ট হয়ে যাবে। সেই কারণেই মজুত বিড়ি বাজারজাত না হলে কোনওমতেই উৎপাদন করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে বিড়ি কোম্পানিগুলি।

- Advertisement -

কালিয়াচকের বালিয়াডাঙ্গা মোড়ের মহামায়া ভাণ্ডার বিড়ি ফ্যাক্টরির ম্যানেজার সুব্রত পাল জানিয়েছেন, লকডাউন ঘোষণার পর থেকে ফ্যাক্টরিতে এই মুহূর্তে চার কোটি ৩০ লক্ষ বিড়ি মজুত আছে। এই বিড়ি সম্পূর্ণভাবে অসমে বাজারজাত করা হয়। এই মুহূর্তে যেহেতু অসমে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, এত বিড়ি নিয়ে কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। ফ্যাক্টরির মালিক বিপ্লব পাল বলেন, মজুত বিড়ি একমাসের মধ্যে বাজারজাত না করা গেলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। তাই এখন আমরা উৎপাদন শুরু করতে পারব না। আমরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি যাতে এই সমস্ত মজুত থাকা বিড়ি বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা হয়। তা না হলে গোটা দেশে এই পরিস্থিতি বিড়িশিল্পে চরম আঘাত আনবে।

কালিয়াচকের শ্যাম বিড়ি ফ্যাক্টরিরও একই অবস্থা। ফাক্টরির ম্যানেজার বিপি সিং জানান, আমাদের বিড়ি মূলত উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে রপ্তানি হয়। এই মুহূর্তে ফ্যাক্টরিতে প্রায় তিন কোটি বিড়ি পড়ে রয়েছে। বুঝতে পারছি না এই বিড়ির ভবিষ্যৎ কী হবে। এই পরিস্থিতিতে আমরা নতুন বিড়ি উৎপাদন করতে পারছি না। মজুত বিড়ি বাজারজাত করা না গেলে মালদার একজন বিড়ি শ্রমিকের কাছেও আমরা বিড়ির পাতা পৌঁছে দিতে পারব না। পশ্চিমবঙ্গ সংগ্রামী বিড়ি মজদুর ইউনিয়নের জেলা সভাপতি ইব্রাহিম শেখ বলেন, মুখ্যমন্ত্রী বিড়ি শ্রমিকদের ক্ষেত্রে লকডাউন শিথিল করলেও কোনও বিড়ি কোম্পানির মালিক এখনও তাঁদের ফ্যাক্টরি খুলছেন না। এই মুহূর্তে প্রতিটি ফ্যাক্টরিতে দুই থেকে তিন কোটি করে বিড়ি মজুত হয়ে আছে। মালদা জেলায় যদি ছোট-বড় মিলিয়ে ৫০ থেকে ৬০টি ফ্যাক্টরি থাকে, তাহলে পরিমাণটা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। আমরা সংগঠনের তরফে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এই সমস্যা সমাধানের জন্য লিখিতভাবে আবেদন জানাব। নইলে বিড়িশিল্পের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। নতুন উৎপাদন করতে গেলে আগে রাজ্যের সমস্ত বিড়ি কোম্পানিতে মজুত বিড়ি বাজারজাত করতে হবে।

পশ্চিমবঙ্গ বিড়ি শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক স্বপন চন্দ্র জানান, চরম সংকটের মধ্যে রয়েছি। বিড়িশিল্প চলে চারটি ফেজে। বিড়ি তৈরি, টেস্টিং, প্যাকেজিং ও মার্কেটিং। এর মধ্যে কোনও একটি স্টেজ বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব নয়। আমরা চাইব যাতে সমস্ত ইউনিয়ন ও বিড়ি মালিক এক টেবিলে বসে সমাধান সূত্র বের করে মুখ্যমন্ত্রীর দারস্থ হন। আইএনটিটিইউসির জেলা সভাপতি মানব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়িতে মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে একাংশ লকডাউন করে চা উৎপাদন প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে চালু করার চেষ্টা করছেন, ঠিক একইভাবে আমরাও চাই, রাজ্যে বিড়ি উৎপাদন ফের চালু হোক। এই রাজ্যে মজুত থাকা বিড়ি যাতে পশ্চিমবঙ্গ সহ ভিনরাজ্যে পাঠানো যায়, তার জন্য আমাদের সংগঠনের তরফেও মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানানো হবে। নইলে এই লকডাউনের কোপে জেলার প্রায় চার লক্ষ বিড়ি শ্রমিক তাঁদের রোজগার হারাবেন।