ত্যাগী বিজন আজও অনুপ্রেরণা জোগান ছাত্রছাত্রীদের

145

কৌশিক সরকার, চৌধুরীহাট : টিভির পর্দায় বা সংবাদপত্রে মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের দিনক্ষণ প্রকাশিত হলে আজও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া চৌধুরীহাট ও সংলগ্ন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয় একটাই নাম। বিজন রায়। ১৯৬৭ সালে স্কুল ফাইনাল পরীক্ষায় দিনহাটা-২ ব্লকে চৌধুরীহাট বিবেকানন্দ বিদ্যামন্দিরের পড়ুয়া বিজনবাবু রাজ্যের মেধাতালিকায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেছিলেন। সম্ভবত সমগ্র দিনহাটা মহকুমায় তিনিই প্রথম পড়ুয়া, যিনি রাজ্যের মেধাতালিকায় স্থান দখলে সমর্থ হয়েছিলেন। এরপর দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে ৫০ বছরেরও বেশি সময়। কিন্তু বিজনবাবুর পরিশ্রম, তাঁর মেধা আজও সমানভাবে অনুপ্রেরণার কারণ হয়ে রয়েছে চৌধুরীহাটের বাসিন্দাদের কাছে। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনায় উৎসাহ জোগাতে আজও বাড়ির অভিভাবক থেকে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা বিজনকে আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। আজও পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় এলাকার প্রতিটি বাড়িতে ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে তাদের বাবা-মাকে বলতে শোনা যায়, বিজনের মতো মেধাতালিকায় নাম থাকবে তো?

তবে এলাকায় যিনি এত পরিচিত একজন মুখ, যাঁর মেধা এলাকার গৌরবের কারণ, সেই মানুষটির পক্ষে এই সাফল্য অর্জন কিন্তু অত সহজ ছিল না মোটেই। বিজনবাবুর পরিবার সূত্রে খবর, নয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি সকলের ছোট। গৃহশিক্ষকতার চল সেসময় ছিল না। পড়াশোনার ক্ষেত্রে স্কুলের শিক্ষকরাই তাঁকে যাবতীয় বিষয়ে সাহায্য করতেন। বিজনবাবুর কথায়, দাদাদের প্রচুর রেফারেন্স বই ছিল। সেইসব বই খুব কাজে লেগেছিল। পরীক্ষার ফল ভালো হবে, সেটা জানা ছিল। কিন্তু একেবারে মেধাতালিকায় যে স্থান হবে, তা ভাবিনি। স্থানীয় গ্রন্থাগারিক জীবনকৃষ্ণ সরকার বিজনবাবুকে প্রচুর বই দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।

- Advertisement -

বিজনবাবুর তৎকালীন শিক্ষক বর্ষীয়ান কানুকৃষ্ণ সরকার বিজনবাবুর অসম্ভব মেধার কথা বলতে গিয়ে জানান, বিজ্ঞান, কলা, সাহিত্য প্রতিটি বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা ছিল বিজনের। বোর্ডের পরীক্ষায় ওর ভালো ফলের কারণে পরবর্তী সময়ে স্কুলে পড়াশোনার পরিবেশটাই বদলে গিয়েছিল।

স্কুল ফাইনাল পরীক্ষার পর প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো ফল করেন তিনি। এরপর ডাক্তারি পড়ার জন্য কলকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে প্রতিটি বর্ষে আশানুরূপ ফল করেন বিজনবাবু। কিন্তু এত মেধা সত্ত্বেও, ঝাঁ চকচকে জীবনের সম্ভাবনা থাকলেও বিজনবাবু নিজেই যেন সরে এলেন সেই জীবন থেকে। এমবিবিএস-এর চূড়ান্ত বর্ষে হঠাৎ যেন উলটো খাতে বইতে শুরু করল তাঁর জীবন।

বিভাস রায় বিজনবাবুর ভাইপো। দিনহাটা মহকুমা হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বিভাসবাবু বলেন, এমবিবিএস-এর চূড়ান্ত বর্ষে হঠাৎ যেন কী একটা হয়ে যায় ওঁর। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের অনুরাগী হয়ে পড়েন। বন্ধুবান্ধব, শিক্ষকরা অনেকবার বলা সত্ত্বেও আর চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষায় বসেননি। আজও ঠাকুর, মা ও স্বামীজির বই পড়েই সময় কাটে তাঁর। সেসবের মধ্যেই জীবনের উদ্দেশ্য, অর্থ খুঁজে বেড়ান।

প্রশ্ন একটাই, হঠাৎ কেন এই জীবনকে বেছে নেওয়া? এর উত্তর জানা নেই বিজনবাবুরও। তিনি বলেন, স্পষ্ট কোনও কারণ আছে কি না, জানি না। কী হয়েছিল, ঠিক বলতে পারি না। আসলে কথায় বলে না, জীবনটাকে নতুন করে আবিষ্কার করার জন্য কখনো-কখনো সব ছেড়েছুড়ে হারিয়ে যেতে হয়। বিজনবাবুও হয়তো সেটাই উপলব্ধি করেছিলেন।