রাজ্যের সঙ্গে সন্ধির প্রস্তাব, পাহাড়ে ফিরতে মরিয়া বিমল

1053

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : বিজেপিতে আর ভরসা নেই, তাই পাহাড়ে ফেরার রাস্তা তৈরি করতে তৃণমূল কংগ্রেসের শরণাপন্ন বিমল গুরুংরা। প্রয়োজনে তৃণমূল কংগ্রেসের ঝান্ডা হাতে নিতেও রাজি এই শিবিরের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। শুনতে অবাক লাগলেও গুরুংবাহিনীর পক্ষ থেকে এমনই প্রস্তাব পেঁছেছে তৃণমূল হাইকমান্ডের কাছে। এমনকি বিনা শর্তেই এই সন্ধির প্রস্তাব দিয়েছেন বিমল। টিম পিকের পরামর্শ অনুযায়ী, ভোটের অঙ্কে সুবিধা পেতে বিমলদের সঙ্গে হাত মেলাতে আপত্তি নেই তৃণমূলের। তবে শর্ত একটাই, আদালত থেকে সমস্ত মামলায় জামিন নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু রাজ্যের সম্মতি ছাড়া কি বিমলরা আদালত থেকে সমস্ত মামলায় জামিন পাবেন? রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্য সরকার এবং শাসকদল তৃণমূল চাইলে বিমলদের জামিন পাওয়ার জন্য ফ্রি স্পেস দিতেই পারে। বিষয়টি নিয়ে মোর্চা শিবিরের সেকেন্ড ম্যান রোশন গিরির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুধু বলেছেন, নো কমেন্ট।

২০১৭ সালের ৮ জুন দার্জিলিংয়ে রাজভবনে রাজ্য মন্ত্রীসভার বৈঠক করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেদিনই ভাষা স্বীকৃতির দাবিকে সামনে রেখে পাহাড়ে হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু করে বিমল গুরুং অ্যান্ড কোম্পানি। গোটা পাহাড়ে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। প্রচুর সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, একজন পুলিশ অফিসার খুন, বিমলের বাড়ি এবং মোর্চার কেন্দ্রীয় কার্যালয় সিংমারি পার্টি অফিস থেকে প্রচুর বিস্ফোরক উদ্ধারের ঘটনায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে পাহাড়। পুলিশের নিত্যদিনের অভিযানে বিমলরা পাহাড় ছেড়ে আত্মগোপনে বাধ্য হন। একটি, দুটি করে মামলা জুড়তে জুড়তে বিমল, রোশনদের বিরুদ্ধে অন্তত ১৩৫টি করে মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলাও রয়েছে। তাঁদের বাড়ি, গাড়ি সহ সমস্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছে। পরবর্তীতে ভোটার লিস্ট থেকে নামও বাদ দেওয়া হয়েছে এই দুই শীর্ষ নেতা সহ অনেকেরই। ফলে বর্তমানে কার্যত পাহাড়ে ভিটেমাটি-হারা বিমল, রোশনরা। গত তিন বছর ধরে তাঁরা বিজেপির শরণাপন্ন হয়ে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছেন। এই নেতারা কখনও দিল্লি, কখনও গুরগাঁও আবার কখনও নেপালে আত্মগোপন করে থাকছেন। কিন্তু বিজেপি বারবার গোর্খাল্যান্ডের দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু করা, পাহাড়, ডুয়ার্সের ১১টি জনজাতিকে তপশিলি উপজাতির মর্যাদা দেওয়ার দাবি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও এখনও বাস্তবে কিছুই পায়নি পাহাড়। ফলে বিজেপিতে আর ভরসা রাখতে পারছেন না বিমল গুরুংরা।

- Advertisement -

সম্প্রতি দার্জিলিংয়ে সাংসদের মাধ্যমে বিজেপি পাহাড়ে দলীয় সদস্য সংগ্রহের কাজ শুরু করায় সেই ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন বিমল, রোশন। মোর্চার দাবি না মিটিয়ে মোর্চাকে ভাঙার চক্রান্ত হচ্ছে বলে রোশন গিরি প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে এভাবে আর কতদিন লুকিয়ে থাকা সম্ভব? তাই বাধ্য হয়ে তৃণমূলের সঙ্গে সন্ধি করে পাহাড়ে ফেরার ছক কষছেন বিমল। এই ব্যাপারে পাহাড়ের দলীয় নেতাদের নিয়ে বিমল এবং রোশন সম্প্রতি বৈঠকও করেছেন। সেই বৈঠকে লোপসাং লামা, ননীতা গৌতম সহ অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারপরেই ডুয়ার্সের মোর্চা নেতাদের নিয়ে বিমল ঝাড়খণ্ডে একটি বৈঠক করেছেন বলেও খবর রয়েছে। বিমলের পক্ষ থেকে তৃণমূলের কাছে বিনা শর্তে সন্ধির প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু তৃণমূলের বক্তব্য, আদালতে আত্মসমর্পণ করে সমস্ত মামলা থেকে জামিন নিয়ে আসতে হবে। কয়েকদিন আগে শান্তা ছেত্রীর উপস্থিতিতে বিমল শিবিরের বেশ কয়েকজন নেতা-নেত্রী তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। দলীয় সূত্রের খবর, বিমলের নেতৃত্বাধীন মোর্চার শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু নেতা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তৃণমূলে যোগ দিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তৃণমূল বিমলদের নিয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছে? দলীয় সূত্রের খবর, টিম পিকের অঙ্ক অনুযায়ী, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার জেলায় এমন ১৬টি বিধানসভা আসন রয়েছে যেখানে বিমলের প্রভাব রয়েছে। তাই বিমলকে হাতে রাখতে পারলে এই আসনগুলি দখল অনেকটা সহজ হবে। কিন্তু সন্ধির প্রস্তাব দিলেও বিমলের থিংকট্যাংকের অবশ্য আরেকটা ভাবনা কাজ করছে। বিমল শিবিরের এক নেতা বলেছেন, তৃণমূল ২০২১-এ ক্ষমতায় ফিরবে তো? না ফিরলে বিজেপি তো তখন বিমলকে ছেড়ে কথা বলবে না। তখন একূলও যাবে, ওকূলও যাবে। কাজেই পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে তা নিয়ে হিসেবনিকেশ করেই পা ফেলতে চাইছেন বিমল।