বিমলের অস্ত্র এখন বুমেরাং হয়ে ফিরছে

রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : কর্মফল, নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। দার্জিলিং-কালিম্পং-কার্সিয়াংয়ে বিমল গুরুংয়ে বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে মিছিল হচ্ছে দেখে এমনই মনে করছেন পাহাড়ে মানুষ। একসময় যে অস্ত্রে যেভাবে সুবাস ঘিসিংকে পাহাড়ছাড়া করেছিলেন বিমল গুরুং-রোশন গিরিরা, আজ ঠিক সেইভাবেই তাঁরই একসময়ে দুই বিশ্বস্ত অনুচর বিনয় তামাং এবং অনীত থাপা বিমলকে পাহাড়ে উঠতে বাধা দিচ্ছেন। বিমলকে সমতলেই রেখে দেওয়ার দাবি তুলে পাহাড়ে প্রতিদিন মিছিল করাচ্ছেন এই দুই নেতা। ফলে এখন পাহাড়ে ফিরতে পারবেন কি না, সেই আশঙ্কায় ভুগছেন বিমল। আর পাহাড়ে বসে ঘিসিং অনুগামী এবং জিএনএলএফ নেতারা আড়ালে-আবডালে হেসে বলছেন, এটাই তো ভবিতব্য ছিল।

আটের দশক থেকে শুরু করে ২০০৭ সাল পর্যন্ত পাহাড়ে শেষ কথা ছিলেন সুবাস ঘিসিং। তাঁর দল জিএনএলএফের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল পাহাড়জুড়ে। অনেকে বলেন, ঘিসিং না চাইলে পাহাড়ে একটি গাছের পাতাও পড়ত না। এহেন অবিসংবাদী নেতাকে পাহাড়ছাড়া করেছিলেন তাঁরই শিষ্য বিমল গুরুং। ২০০৭ সালের ৭ অক্টোবর বিমলের নেতৃত্বে পাহাড়ে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার আবির্ভাব। কে এই বিমল গুরুং? আটের দশকের প্রথমদিকে সিংমারিতে একটি কষাইখানায় মাংস কাটতেন। ১৯৮৬-১৯৮৭ সালে পাহাড়ে গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে জিএনএলএফের সঙ্গে যুক্ত হন বিমল। নজরে পড়েন ঘিসিংয়ে। ১৯৮৮ সালে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিলের (ডিজিএইচসি) নির্বাচনে পাতলেবাস এলাকা থেকে বিমলকে টিকিট দেন ঘিসিং। বিমল সভাসদ নির্বাচিত হন। ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ বিভাগের দায়িত্বও পান। ধীরে ধীরে ঘিসিংয়ে সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছিল বিমলের। পরবর্তী সময়ে ঘিসিংয়ে সঙ্গে মতভেদ এবং সেই বিমলই ২০০৭ সালে ঘিসিংসঙ্গ ছেড়ে গোর্খাল্যান্ডের আওয়াজ তুলে নতুন দল গড়েন। মনে মনে ঘিসিংকে পাহাড়ছাড়া করার শপথও নিয়েছিলেন।

- Advertisement -

অশান্ত পাহাড়ের পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০০৮ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রের তলবে দিল্লি যান সুবাস ঘিসিং। ব্যাস, আর তাঁকে পাহাড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। তিনি দিল্লি থেকে ফেরার পরেই পাহাড়জুড়ে অবরোধ শুরু করে বিমলের নেতৃত্বাধীন মোর্চা। সুবাস ঘিসিংকে গো ব্যাক স্লোগান দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে জেট ক্যাটিগোরির নিরাপত্তা পাওয়া সত্ত্বেও ঘিসিংকে পাহাড়ে ফেরানোর ঝুঁকি নেয়নি প্রশাসন। সপরিবারে ঘিসিংয়ে ঠাঁই হয়েছিল তিনবাত্তির তিস্তা প্রকল্পের বাংলোয়। শুধু কি তাই, পরের মাসেই অর্থাৎ ২০০৮-এর অগাস্ট মাসে শিলিগুড়িতেই একটি বেসরকারি হাসপাতালে ঘিসিংয়ে স্ত্রীর মৃতু্য় হয়। মৃতদেহ সৎকারের জন্যও পাহাড়ে নিয়ে যেতে বাধা দিয়েছিলেন বিমলরা। পাহাড়জুড়ে পথ অবরোধ করা হয়েছিল। বাধ্য হয়ে সমতলে দেহ সৎকারের ব্যবস্থা করে প্রশাসন। পরবর্তীতে ঘিসিং কখনও তিনবাত্তির তিস্তা প্রকল্পের বাংলো, কখনও মাটিগাড়া, আবার কখনও জলপাইগুড়িতে মাসের পর মাস কাটিয়েছেন। জীবিত অবস্থায় তিনি আর পাহাড়ে ফিরতে পারেননি।

বিমলের সেই অস্ত্রই এখন বুমেরাং হয়ে ফিরছে। ২০০৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে বিমল গুরুং পাহাড়ের শেষ কথা হয়ে উঠেছিলেন। তাঁকেই এখন পাহাড় থেকে তাড়ানোর তোড়জোড় শুরু করেছেন বিনয় তামাং-অনীত থাপারা। অথচ এই বিনয়-অনীতই মোর্চার আন্দোলনে বিমলের সবচেয়ে আস্থাভাজন দুই নেতা ছিলেন। পাহাড়ের রাজনৈতিক মহল বলছে, দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে থাকা বিমল ফের পাহাড়ে উঠলে তাঁদের সাম্রাজ্য তছনছ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন বিনয়, অনীতরা। তাই যেনতেনপ্রকারেণ বিমলের পাহাড়ে ওঠা আটকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন এই দুই নেতা। যদিও বিনয়দের বক্তব্য, বিমল পাহাড়ে উঠলেই শান্ত পাহাড়ে অশান্তি পাকাবেন। তাই তাঁকে সমতলেই রাখা হোক। শিলিগুড়ি বা ডুয়ার্সে কোথাও তাঁকে রাখার ব্যবস্থা করুক রাজ্য সরকার। এই দাবিই তাঁরা মঙ্গলবার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে পাহাড়ে ওঠার ছাড়পত্র পেতে বিমলকে ঘুরপথে বিনয়, অনীতের সম্মতির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

সুবাস ঘিসিং পাহাড়ে ফিরতে না পারলেও মোর্চার শত চেষ্টায়ও পাহাড়ে জিএনএলএফ মুছে যায়নি। বরং মোর্চা দু-টুকরো হওয়ায় সুবাস ঘিসিংয়ে ছেলে মন ঘিসিংকে সামনে রেখে আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেন জিএনএলএফ কর্মী-সমর্থকরা। পাহাড়ের অনেকে মনে করেন, বিমল-রোশনের আগ্রাসী রাজনীতির কাছে বাধ্য হয়ে বসে গেলেও জিএনএলএফের অনেকেই মন থেকে মোর্চার রাজত্ব মেনে নিতে পারেননি। এখন বিমলের অবস্থা দেখে তাঁরা মনে মনে হাসছেন। জিএনএলএফের সাধারণ সম্পাদক মহেন্দ্র ছেত্রী বলেন, একসময় সুবাস ঘিসিংকে এভাবেই পাহাড়ে উঠতে দেননি বিমল গুরুং। এখন তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন সেদিন কতটা অন্যায় করেছিলেন। নিজের কাজের ফল ভোগ করছেন বিমল।