পাংচার সারাইয়ের হাত বই ধরতে ব্যাকুল

145

অভিজিৎ ঘোষ, আলিপুরদুয়ার : কয়েকটি টায়ার, টিউব আর সাইকেল সারাইয়ের কিছু যন্ত্রপাতি নিয়ে পাড়ার মোড়ে বসে অপেক্ষা করছিল ছেলেটি। চোখ দুটো এদিক-ওদিক কাকে যেন একটা খুঁজে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা পরিষ্কার হল একটু বাদে। হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিজের সাইকেলটা এনে একজন ছেলেটির সামনে দাঁড়ালেন। বললেন, সাইকেলের পাংচারটা ঠিক করে দিতে হবে ভাই। খানিক বাদে এলেন আরও একজন। তাঁর দাবি, সাইকেলের ঢিলেঢালা চেনটা সামান্য টাইট করে দিলে ভালো হয়। কৌতূহলী চোখ দুটি তখন টিউবের লিক উদ্ধারে ব্যস্ত। এইভাবে ধীরে ধীরে খদ্দেরের সংখ্যা একটি-দুটি করে বাড়তে থাকে। হাসিমুখে সবার সব আবদার পূরণ করছে ছেলেটি। করবেই বা না কেন? যতই হোক, খদ্দের হল লক্ষ্মী। কিন্তু ওই হাসিমুখের আড়ালে যে একটা প্রচ্ছন্ন বেদনা ছিল, সেটা কি খদ্দেরদের কেউ দেখতে পেলেন? হয়তো পাননি।

আলিপুরদুয়ার শহর সংলগ্ন দক্ষিণ জিৎপুরের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ সরকার এবছরের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। শহরের নেতাজি বিদ্যাপীঠের ছাত্র বিশ্বর বাড়িতে বাবা, মা এবং দিদি রয়েছেন। সাইকেল সারাইয়ের দোকানটি বিশ্বজিতের বাবার। কিন্তু টোটো চালান বলে সবসময় দোকানের দিকে নজর রাখতে পারেন না। এদিকে, সারাদিন টোটো চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের অভাব ঘোচে না। অভাবের সংসারে একসময় বিশ্বজিতের দিদিকে পড়াশোনায় ইতি টানতে হয়েছে। কিন্তু শত অভাবের মধ্যেও বিশ্ব নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু অভাবের সংসারে যেখানে দুমুঠো ভাত জোগাতে কালঘাম ছোটে, সেখানে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া কষ্টসাধ্য। তাই বিশ্ব সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাবাকে সাহায্য করার। করোনাকালে স্কুল বন্ধ। তার ওপর পরীক্ষাও হচ্ছে না। এই অবস্থায় বিশ্ব স্থানীয় পল্লিমঙ্গল ক্লাবের পাশের মোড়ে বাবার দোকানে বসে পড়েছে। সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একের পর এক সাইকেলের নানা সমস্যার সমাধানে বিশ্ব এখন মহাব্যস্ত।

- Advertisement -

বিশ্বজিতের কথায়, দিদি পড়া ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি পড়াশোনা করতে চাই। বাবা সারাদিন টোটো চালান। দোকানে সময় দিয়ে উঠতে পারেন না। তাই আমি বাবার পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।বিশ্ব জানায়, বাড়িতে তার স্মার্টফোন নেই। লকডাউনের সময় পাশের বাড়ির এক কাকিমার মোবাইলে কিছুদিন সে অনলাইনে ক্লাস করেছে।  বিশ্ব আরও শিখতে চায়, জানতে চায়।