পদ্ম ফুটছে নকশাল আন্দোলনের আঁতুড়ে

381

মহম্মদ হাসিম, নকশালবাড়ি : সাতের দশকের রক্তঝরা দিনগুলো বেঙ্গাইজোতের এখনকার প্রজন্ম চোখে দেখেনি। তবে বাপ-ঠাকুরদার কাছে গল্প শুনেছে। কারও বাবা-কাকা শরিক ছিলেন সেই আগুনে দিনগুলোর। সুপারি ও বিদেশি পণ্য পাচারের রুট নকশালবাড়িকে সারা দেশ তখন চিনত আন্দোলনের আঁতুড় হিসাবে। লাঙল যার জমি তার, নকশালবাড়ির পথ বিপ্লবের পথ, বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস-র মতো স্লোগানের জন্মও বেঙ্গাইজোত গ্রাম থেকে।

একসময় বাম আন্দোলনের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল নকশাল আন্দোলনের পীঠস্থান বেঙ্গাইজোত গ্রাম। যেখানে একদিন তিরধনুক, বর্শা, দা, কাটারি নিয়ে ভূমিহীনরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন জোতদারদের বিরুদ্ধে। এই বেঙ্গাইজোত গ্রামে ১৯৬৭ সালের ২৫ মে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে জড়ো হয়েছিলেন ভূমিহীন কৃষকরা।  আন্দোলনকারীদের তিরের আঘাতে নিহত হয়েছিলেন নকশালবাড়ি থানার ইনস্পেকটর তেনজিং ওয়াংদি। ফলে নকশালবাড়ির পুলিশ সেদিন আন্দোলনকারীদের খতম করার জন্য তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিল। পথ খুঁজছিল কীভাবে বেঙ্গাইজোত গিয়ে ভেঙে চুরমার করে দেবে আন্দোলনকে। নকশালবাড়ি থানা থেকে ৫-৬ কিলোমিটার দূরে বেঙ্গাইজোত গ্রাম। পুলিশ ছুটে যায় সেখানে। তারপর পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায় আন্দোলনকারীদের ওপর। রক্তাক্ত হয় বেঙ্গাইজোত গ্রাম। এখানে শহিদ হন নয়জন এবং দুটি শিশু। ভারত-নেপাল সীমান্তঘেঁষা এই গ্রামেই বাতারিয়া নদীর পাশে শহিদদের স্মরণে গড়া হয়েছে স্মৃতিসৌধ। এলাকার হাতেগোনা পুরোনো মানুষজনের কাছে এই আন্দোলন ছিল তৎকালীন যুক্তফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে কৃষকদের অধিকারের লড়াইয়ে মতো একটা ঐতিহাসিক ঘটনা।

- Advertisement -

নকশাল আন্দোলনের পীঠস্থান সেই বেঙ্গাইজোত গ্রাম আজ অনেকটাই পালটে গিয়েছে। যে রাস্তার উপর আন্দোলনকারীদের নিথর দেহগুলি পড়ে ছিল সেই রাস্তার দুধারেই আজ তৈরি হয়েছে বিশাল পাকা বাড়িঘর। এলাকার জনবিন্যাসেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। গত কুড়ি বছরে বাংলাদেশ, নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনেকে এই এলাকার কৃষিজমিগুলির চরিত্র পালটে বসতি গড়েছেন। তাঁদের অনেকেই ভারতের স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে নিজের পরিচয়পত্র বানিয়ে ফেলেছেন। বাইরে থেকে আসা নকশালবাড়ির এই নতুন বাসিন্দাদের কাছে নকশাল আন্দোলন একটা ঘটনা।

নকশাল আন্দোলনের স্মৃতি ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেস, সিপিএম এখানে বিধানসভা কেন্দ্র, স্থানীয় ত্রিস্তর পঞ্চায়েত প্রশাসনে রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রেখেছে। এমনকি রাজ্যে পরিবর্তনের সরকারের আমলেও এখানে ঘাসফুল ফোটেনি। কিন্তু উনিশের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস, সিপিএম, ঘাসফুলকে টেক্কা দিয়েছে পদ্মফুল। সিপিএমের বহু নেতা ও কর্মী এখন বিজেপিতে যোগদান করেছেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বেঙ্গাইজোতের লালদুর্গ এখন বিজেপির দখলে। সপ্তাহদুয়ে আগে দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্ট বেঙ্গাইজোতে জনসভা করেন। এই জনসভায় সিপিএমের পঞ্চায়েত সদস্য, উপপ্রধান সহ অনেকেই বিজেপিতে যোগদান করেন। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নকশালবাড়ি, মণিরাম অঞ্চলে বিজেপি ৮,২০৬টি ভোট পায়। সেখানে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৩ হাজার ৩৯৮, সিপিএম-কংগ্রেস জোট ১৪ হাজার ২৫০ ভোট পেয়েছিল। ২০১৯ সালে নকশালবাড়ি ব্লকের এই দুটি অঞ্চলে বিজেপির ভোট দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৯৫৩। মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে নকশাল আন্দোলনের ধাত্রীভূমিতে বিজেপির এই উত্থানের পিছনে অনেকেই অনেক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন।

শহিদ বেদি লাগোয়া বেঙ্গাইজোত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তথা স্থানীয় বাসিন্দা  নৃপেন বর্মন বলেন, প্রতি বছর ২৫ মে এখানে নকশাল আন্দোলনের অনুষ্ঠান হয়। বীর শহিদদের স্মরণ করা হয়, মিছিলও হয়। কিন্তু এখন আর সেই মিছিলে লোক দেখা যায় না। ঐতিহাসিক স্থান হলেও স্মৃতিসৌধগুলিও অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। বাম সংগঠনের কেউ এই ঐতিহাসিক স্থানের দেখভাল করে না। চারদিকে আগাছা, প্লাস্টিক দিয়ে ভর্তি হয়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, এখনও দেশ-বিদেশ থেকে সাংবাদিকরা এখানে আসেন। কাউকে না পেলে স্কুলে আমার সঙ্গে বা অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁরা কথা বলে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান। চোখের সামনে বদলে গেল জায়গাটা।

স্মৃতিস্তম্ভের সামনেই আছে সেদিনের শহিদ ধনেশ্বরী দেবীর বাসভবন। এখানেই তাঁর স্বামী প্রহ্লাদ সিং নকশাল আন্দোলনের পতাকাতলে এসে চারু মজুমদার আর কানু সান্যালের সঙ্গী হয়েছিলেন। আজ তিনি বেঁচে নেই। আছেন তাঁর পুত্র পবন সিং। তাঁরও বয়স এখন ৮০ বছর। তিনি শোনালেন সেদিনের পুলিশের হামলা এবং ১১ জন শহিদ হওয়ার কাহিনী। পাটখেত, বাঁশঝাড়ে, রাস্তায় নিথর দেহগুলি পড়ে ছিল, তা বলতে গিয়ে এখনও কেঁদে ফেললেন তিনি। তিনি বলেন, মা  কমিউনিস্ট মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে চারু মজুমদারের আদর্শে নেমেছিলেন জোতদারদের বিরুদ্ধে জমি দখল আন্দোলনে। পুলিশের গুলিতে মা মারা গেলেন। আমাকে আর বাবাকে গ্রেপ্তার করল পুলিশ। মা-বাবার আদর্শ আঁকড়ে ধরে এখনও বেঁচে আছি। কিন্তু এখন কোনও সংগঠন নেই। যাঁরা ছিলেন তাঁরাও অন্য দলে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকে চারু মজুমদারের শিষ্যের পরিচয় দিয়ে সংগ্রাম ও আন্দোলনের পথ ছেড়ে  সুবিধাভোগ করতে শুরু করলেন, যা এখানকার মানুষ ভালো চোখে দেখেননি। স্থানীয় কৃষক উরেন বর্মন বলেন, যে জমির জন্য আন্দোলন সেই জমির এখন আকাশছোঁয়া দাম। বহিরাগতদের অনুপ্রবেশে এলাকায় জমির দাম বেড়েই চলেছে। আমরা স্থানীয়রাই একদিন সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়ে যাব। আমার বর্তমানে ভিটেমাটি ছাড়া কিছু নেই। অন্যের জমিতে বিঘা প্রতি পাঁচ মন ধান দিয়ে চাষ-আবাদ করছি। কৃষকদের নানা সুবিধা দেয় সরকার শুনেছি। কিন্তু আমাদের নিজের জমি নেই, তাই কোনওরকম সুবিধা পাইনি।

আরেক বাসিন্দা শম্ভু বর্মন বলেন, গ্রামে রাস্তা, পানীয় জল, পথবাতি সবকিছুরই সমস্যা রয়েছে। আন্দোলনের সময় আমরা ছিলাম না। তবে ১০-১২ বছর আগে ২৫ মে আসতেই দেখতাম সপ্তাহখানেক আগে গোটা রাস্তা দখল করে চার-পাঁচশো লোকের জমায়েত হত। তাঁরা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতেন। সপ্তাহখানেক ধরে শহিদ বেদিতে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হত। এখন আর তেমন কিছু দেখা যায় না। এলাকার বাসিন্দারা মেনে নিচ্ছেন, এখানকার বদলে যাওয়া জনবিন্যাসই নকশালবাড়ির ভূমিপুত্রদের তাঁদের ইতিহাস ভুলিয়ে দিচ্ছে। বিত্তশালী বহিরাগতরাই এখন নকশালবাড়ির ভাগ্যবিধাতা, যে বিত্তশালীদের বিরুদ্ধে লড়াই নকশালবাড়িকে তার পরিচয় তৈরি করে দিয়েছিল।