উত্তরের অঙ্ক মিলছে না মালদায়

94

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, মালদা : ছোট্ট সেই গ্রামের নাম চৌকাহার। জেলা দক্ষিণ দিনাজপুর। বুনিয়াদপুর শহর থেকে হরিরামপুরের দিকে এগোনোর পথে দেখা হবে এ গ্রামের সঙ্গে। বাঁদিকে তাকান। দেখা মিলবে বাংলায় ভোট প্রচারের অন্যতম সেরা ছবির।

বিশাল খেতের মাঝে যথেষ্ট বড় আয়তাকার জায়গায় পরপর সারি দিয়ে ঝুলছে তৃণমূল, বিজেপি এবং সিপিএমের পতাকা। যতরকমভাবে সাজানো যায়। কোথাও তিন পার্টির পতাকা পরপর মাটিতে লাগানো। কোথাও একটা বিশাল বাঁশে ফুলগাছের মতো বানানো হয়েছে পতাকা গাছ। বহু কাগজের পতাকা লাগানো সে বাঁশে। পুরোটাই একটা নিজস্ব ছন্দে। এভাবে গ্রামীণ খেতে কোথাও যেন মিলে গিয়েছে নির্বাচনে প্রধান তিনটি দল। হাওয়ায় উড়ছে পতাকার দল। মন বলছে, কী সুন্দর, কী সুন্দর।

- Advertisement -

গ্রামে খুব কম দোকান। ভরদুপুরে একটাই দোকান খোলা। তরুণ দোকানদার গর্বের সঙ্গে খেত লাগোয়া স্কুলঘরটি দেখিয়ে বলেন, ওই দেখুন আমাদের বুথ। আমাদের গ্রামে সব পার্টির সমর্থক রয়েছেন। তৃণমূল হয়তো একটু বেশি। সবাই মিলেমিশে সাজিয়েছি জায়গাটা।

দেখতে দেখতে অবধারিত মনে হবে, আহা, এমন ভাবনা যদি বাংলার সব গ্রাম দেখাতে পারত! তাহলে শীতলকুচি, নানুর, গড়বেতা দেখতে হত না বাংলার মানুষকে। ভোটের জন্য উত্তরবঙ্গ ঘুরে বেড়ালে যে কোনও স্বাভাবিক মানুষকে বিদ্ধ করবে একটা সরল অঙ্ক। সরল এবং মর্মান্তিক। হিন্দুপ্রধান গ্রামগুলোতে বিজেপির দাপট, মুসলিমপ্রধান গ্রামে তৃণমূল কংগ্রেসের। এত সহজে ভাগাভাগি হয়ে গেল ভোটারদের মনস্তত্ত্ব? দুই দিনাজপুর পেরিয়ে মালদায় পা রাখলে এই প্রশ্ন অন্যভাবে বিদ্ধ করবে।

এমনিতে বরকত গনি খানের মালদায় রাজনীতির আপাত অবস্থা খুব খারাপ। একজন নেতাও নেই, যাঁকে সারা বাংলা চেনে। একটা সময় কংগ্রেস, বামপন্থী এমনকি জনসঙ্ঘের অনেক পরিচিত নেতা ছিলেন এ জেলায়। পরপর উঠেছে প্রজন্ম। সুবোধ মিশ্র, শান্তি সেন থেকে মানিক ঝাঁ-শৈলেন সরকার। সৌরীন্দ্রমোহন মিশ্র-অতুল কুমার-রামপ্রসন্ন রায় থেকে উমা রায়-রামহরি রায়-বিষ্ণুব্রত ভট্টাচার্য। হরিপ্রসন্ন মিশ্র থেকে তপন শিকদার। নিকুঞ্জবিহারী গুপ্ত-বীরেন্দ্রকুমার মৈত্র থেকে ইলিয়াস রাজি-মহবুবুল হক-মায়া বন্দ্যোপাধ্যায়। মাঝে গৌতম চক্রবর্তী তরুণ কংগ্রেস নেতা হিসেবে নাম করেছিলেন। তিনি এবার কলকাতার ঢাকুরিয়ার বাড়িতেই আছেন। পুরো সুস্থ নন বলে আসেননি।

এখন তৃণমূলের কৃষ্ণেন্দুনারায়ণ চৌধুরী বা সাবিত্রী মিত্রদের ভাবমূর্তি খুব খারাপ বললেও কম বলা হয়। বিজেপির খগেন মুর্মুরও তাই। শহরের অনেকে আবার শেষজনের নামও জানেন না। গনির উত্তরসূরি হিসেবে যাঁকে বলা হচ্ছিল, মৌসম নুর দারুণ শুরু করে কার্যত হারিয়ে যাওয়ার পথে। বেরিয়ে পড়ছে যাবতীয় সীমাবদ্ধতা। গনি খানের দুই ভাই শুধু জিতেছেন, কিন্তু বাড়তি সম্ভ্রম আদায় করতে পারেননি। অন্য পার্টিতে তেমন মুখই নেই।

শহরের রথবাড়ির মোড় বা ফোয়ারা মোড়ে জেলার বর্তমান নেতাদের সম্পর্কে জনতার যা বিশ্লেষণ শোনা গেল, তা মোটেই ভালো নয়। গোপাল দেবনাথ বলে একজন রথবাড়ি ব্রিজের নীচে আক্ষেপ করলেন, নেতাদের দুর্দশা দেখলে বলতে হবে, মালদা এখন মুণ্ডহীন ধড়। ঠিক যে ভঙ্গিতে বালুরঘাটে বন্ধ কংগ্রেস ভবনের সামনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র নৃপেন ভৌমিক বলেছিলেন, বিশ্বনাথ চৌধুরী না থাকলে বালুরঘাট একেবারে বালুর দুর্গ। এমনিতেই বঞ্চিতদের দলে বালুরঘাট। এরপর কেউ চিনবে না।

মালদার সেই বহুকথিত গনি-মিথ? এই জেলায় কংগ্রেস আজও বেঁচেবর্তে বলে এখানে গনির নাম করেন অনেকে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, যত প্রশংসাই হোক, গনি-মিথ আসলে সাম্প্রদাযিক তাসের অঙ্গ ছিল। যা অতি সূক্ষ্মভাবে, নিখুঁত অঙ্ক কষে ছড়ানো হত গনি খানের আমল থেকে। মালদায় চিরকালই মুসলিম ভোটার বেশি। গনির টার্গেট থাকতেন মুসলিমদের বৃহত্তম অংশ শেরশাবাদিয়ারা। যদিও চাকরি বিলির সময় হিন্দু-মুসলিম দেখতেন না গনি।

৪০ বছর পরে গনি আমলের উন্নতি মনে রেখে ভোট দেবে না বেশি লোক। বরং জাতপাত আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরিশ্চন্দ্রপুরে কিছু না করেও একদা বারবার সাইকেল চিহ্নে জিততেন গুরুত্বহীন ওয়ার্কার্স পার্টির ইলিয়াস রাজি। বরকতের কর্মীদের মতো এই কাজটা করতেন চণ্ডীপুরের সুভদ্র প্রগতিশীল ইলিয়াসের সমর্থকরা। সিপিএমও একভাবে কাজ করেছে বারবার মুসলিম প্রধান অঞ্চলে মুসলিম প্রার্থী দাঁড় করিয়ে।

সেই সাম্প্রদাযিক বিষ প্রতিবার ভোটের সময় বয়ে চলে মালদায়। এবার তা আরও ভয়াবহ রূপে আবির্ভূত। ফরাক্কার কাছে জাতীয় সড়কে পাগলা নদীর ব্রিজ পেরিয়ে বৈষ্ণবনগর মোড়। কাছাকাছি ব্যাংক, মিষ্টির দোকান, কাপড়ের দোকান। সেখানে যেমন একজনকে অম্লান বদনে বলতে শোনা গেল, আমাদের এদিকে মুসলিমপাড়া। ভোট পাবে টিএমসি আর কংগ্রেস। হাইওয়ের ওপারে চামাগ্রাম স্টেশন পর্যন্ত হিন্দুপাড়া। সেখানে বেশি ভোট পাবে বিজেপি। মালদা অতুল মার্কেটের কাছে একজন কথার ভেলা ভাসানোর মাঝে মন্তব্য করলেন, গনির মালদা আর নেই। বরং এবার অনেক বেশি পদ্মফুল গুনবেন।

এসব শুনে মনে পড়বে ২০১১ সালের সেন্সাস রিপোর্ট। দশবছর আগের সেন্সাসে দেখা যাচ্ছে, মালদায় মুসলিম জনসংখ্যার হার ৫১.২৭ শতাংশ, হিন্দু ৪৭.৯৯ শতাংশ। দক্ষিণ দিনাজপুরে হিন্দু ৭৩.৫৫ শতাংশ, মুসলিম ২৪.৬৩ শতাংশ। মালদা জেলার প্রাক্তন বিধায়ক তথা তৃণমূল নেতা গৌতম চক্রবর্তী একসময় গনির খুব কাছের লোক ছিলেন। কলকাতায় গৃহবন্দি গৌতমকে ফোনে ধরলে তিনি বললেন, বরকতদা মাঝে মাঝে আমাদের বলতেন, দেখবি, ভোটের সময় শেরশাবাদিয়ারা সবাই একজায়গায় ভোট দেবে।  মালদার পাশে মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুরেও একই ব্যাপার হবে। ওঁর কথাটা যে কতটা সত্যি, বুঝতে পেরেছি বারবার। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এবার মালদায় বিজেপি পারবে না। অধিকাংশ ভোট পাবে তৃণমূল বা কংগ্রেস। দুটো পার্টির ভোট কাটাকাটিতে কি বিজেপিরই শেষ পর্যন্ত সুবিধে হবে না? এককালের নামী যুব কংগ্রেস নেতার বিশ্লেষণ, হবে না। যেই জিতুক, জিতবে। বিজেপি তো হারবেই।

ইঙ্গিতে মানেটা খুব সোজা মনে হল। মালদায় বিজেপির প্রতিপক্ষ এবার শুধু তৃণমূল নয়, কংগ্রেসও। পদ্মাসন এ জেলায় কত নিখুঁত দাঁড়াবে, তা নির্ভরশীল ঘাসফুল ও হাতের ভোট কাটাকাটির ওপর। অধিকাংশ আসনের ভবিষ্যতের সঙ্গে লেপটে রয়েছে যদি এবং কিন্তুর মতো শব্দ। উত্তরবঙ্গের বাকি সব জেলার যাবতীয় নদী এবার ভোটে যে প্রচলিত অঙ্ক দেখেছে, তার বাইরে অন্য অঙ্ক দেখতে পাচ্ছে মালদার মহানন্দা, ফুলহর, কালিন্দী।