গোর্খাল্যান্ড নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করুক বিজেপি

829

রণজিৎ ঘোষ : গোর্খাল্যান্ড হল দিল্লি কা লাড্ডু। পাহাড় নিয়ে কেন্দ্রের রাজনীতিটা দীর্ঘদিন ধরে এমনই। পাহাড় এখন শান্ত। করোনা আবহে ঘরবন্দিও বটে। বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ে হঠাৎ গরম রাজনৈতিক হাওয়া বয়ে এনেছে রোশন গিরির সাম্প্রতিক এক বক্তব্য। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার দুই নেতাকে নর্থ ব্লকে ডেকে পাহাড় নিয়ে নাকি আবার আলোচনা শুরু করার আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা। তা আলোচনার বিষয়বস্তু কী? বিমল গুরুং, রোশন গিরিদের দাবি- গোর্খাল্যান্ড। আমার প্রশ্ন হল, বিজেপি কি সত্যিই গোর্খাল্যান্ড গঠনে নীতিগতভাবে সম্মত? এর আগে দেখা গিয়েছে, দলের কেন্দ্রীয় কিছু নেতা পাহাড়ে পৃথক রাজ্যের পক্ষে সওয়াল করলেও দিলীপ ঘোষ, রাহুল সিনহারা কিন্তু জোরগলায় বাংলা ভাগের বিরোধিতা করেছেন।

অনেকদিন চুপচাপ থাকার পর ২০২১-এর বিধানসভা ভোট আসন্ন দেখে কি আবার ত্রিপাক্ষিক বৈঠক করার কথা মাথায় এল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর? বিজেপি ঘনিষ্ঠ বিমল গুরুং, রোশন গিরি সেই ২০১৭ সাল থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতা সহ নানা আইনে প্রচুর মামলা ঝুলছে। তাহলে এতদিন কেন রাজ্য সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাধানসূত্র খোঁজার উদ্যোগ দেখায়নি কেন্দ্র? তাহলে কি সামনে ভোট বলে গোর্খাল্যান্ডের ফানুসকে আবার পাহাড়ে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে? মানুষকে বোকা বানানোর চেষ্টাও হচ্ছে? সকলেই জানে, রাজ্য সরকারের সম্মতি না থাকলে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক সম্ভবই নয়।

- Advertisement -

রাজ্য সরকার যে বাংলা ভাগে সায় দেবে না, সে কথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাহাড়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলে গিয়েছেন অনেকবার। তাছাড়া বিমল গুরুং, রোশন গিরিরা এখন রাজ্য সরকারের খাতায় পলাতক। এমন ফেরার নেতাদের সঙ্গে নিশ্চয়ই আলোচনায় বসতে সম্মত হবেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাছাড়া জিটিএ-তে ক্ষমতাসীন বিনয় তামাংপন্থী গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এখন রাজ্য সরকারের অনুগত। তাদের বাদ দিয়ে কোনও আলোচনাতেই যাবেন না মমতা। এসব জেনে-বুঝে আবার পাহাড়কে বিভ্রান্ত করার খেলা শুরু হয়েছে।

এবার প্রশ্ন হল, বিজেপি দল তো একটাই? এমন তো নয় দিল্লিতে একটা দল একরকম নীতি; পশ্চিমবঙ্গে আরেকটা দল, তার অন্য নীতি? যদি তা না হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য নেতত্ব স্পষ্ট করে বলুক না কেন, গোর্খাল্যান্ড বিষয়ে তাদের অবস্থানটা ঠিক কী? আমরাও জেনে যাই, রাজ্যবাসীও জেনে যাক, বাংলা ভাগে আপত্তি আছে কি না বিজেপির। যদি সত্যি আপত্তি থাকে, তাহলে আলোচনা হবে কী নিয়ে নাকি গোর্খাল্যান্ডের গাজর ঝুলিয়ে রাখাই আসল উদ্দেশ্য। যত যাই হোক, গোর্খাল্যান্ডের ভাবনাটার প্রতি পাহাড়বাসীর আবেগ আছে। শুধু ভোট এলেই কি সেই আবেগের কথা মনে পড়ে? এত কথার প্রয়োজনই হত না, যদি না ২০০৯ সাল থেকে পাহাড়ের রাজনীতির সাক্ষী থাকতাম আমরা। লোকসভা বা বিধানসভা, যে কোনও নির্বাচনের আগে পাহাড়ে রাজ্য ভাগের উসকানি দিতে দেখা যায় কেন্দ্রের এই শাসকদলটিকে। আবেগের ভিত্তিতে পাহাড়বাসীর ভোট চেটেপুটে নিয়ে যায়। ভোট শেষে যথারীতি চাপা পড়ে যায় গোর্খাল্যান্ডের দাবি। অথচ ভোটের আগে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই শিলিগুড়িতে এসে বলে যান, গোর্খাদের স্বপ্ন আমার স্বপ্ন। ক্ষমতায় এলে গোর্খাদের দাবি বিবেচনা করা হবে।

অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনি ইস্তাহারেও বারবার গোর্খাল্যান্ডের দাবি সহানুভতির সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েথে বিজেপি। সুব্রহ্মণিয়াম স্বামী, দার্জিলিংয়ে প্রাক্তন সাংসদ যশবন্ত সিনহা, সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া প্রমুখ সর্বভারতীয় বিজেপি নেতা বিভিন্ন সময়ে খোলাখুলি গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে সওয়াল করেছেন। কেন্দ্রীয় সরকারও কখনও বলেনি যে গোর্খাল্যান্ড গঠন সম্ভব নয়। দিল্লির বিজেপি গোর্খাল্যান্ডের স্বপ্ন জিইয়ে রেখে পাহাড়ের ভোট নিশ্চিত করবে আর রাজ্যে সেই দলের নেতারাই সমতলের ভোট অক্ষুণ্ণ রাখতে রাজ্যভাগের বিরুদ্ধে কথা বলবেন- দুই পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখে শুধু সমতল কেন, পাহাড়বাসীও জানতে চাইতে পারেন, দিলীপ ঘোষদের অঙ্ক অনুযায়ী, ২০২১ বিধানসভা ভোটে জয়ী হয়ে সত্যিই যদি তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসেন, তাহলে তার পরবর্তীতে গোর্খাল্যান্ড নিয়ে তাঁদের অবস্থান কী হবে।