অনন্তকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ডুবল ঘাসফুল

242

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : অনন্ত মহারাজকে বিজেপি শিবির থেকে ভাঙিয়ে আনার অপারেশন পুরোপুরি করার আগেই তৃণমূলের কিছু নেতা লাফালাফি শুরু করে দেন। আর তার জেরেই তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের প্ল্যান ভেস্তে যায়। গত বৃহস্পতিবার অসমের বঙ্গাইগাঁওয়ে সতীবরগাঁওয়ে অনন্ত মহারাজের সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক ও তারপর কোচবিহারে রাসমেলার মাঠে অমিত শার সভায় অনন্তপন্থী গ্রেটার কর্মী-সমর্থকদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতির পর এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তাঁদের মতে, কয়েকমাস আগে বিজেপির প্রতি অনেকটা বীতশ্রদ্ধ হয়ে অনন্ত মহারাজের গোষ্ঠীর গ্রেটারের প্রথম সারির নেতারা অত্যন্ত গোপনে তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। কথাবার্তা অনেকটাই এগোনোর পর হঠাত্ তৃণমূলের জেলাস্তরের কিছু নেতা বিষয়টি নিয়ে লাফালাফি জুড়ে দেন। আর তাতেই সব ভেস্তে যায়। বিপদ আঁচ করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব কার্যত অনন্ত মহারাজকে ঘিরে ফেলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের আগে পর্যন্ত যাতে তৃণমূল শিবির তাঁর ধারেকাছে ঘেঁষতে না পারে, তার জন্য কোনও ফাঁক রাখেনি বিজেপি।

বিজেপি সূত্রেই জানা গিয়েছে, সম্প্রতি নানা কারণে অনন্ত মহারাজের অনুগামী গ্রেটাররা তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন।  সূত্রের খবর, মহারাজের ডান ও বাঁ-হাত বলে পরিচিত দুজন নেতা-নেত্রী কলকাতায় গিয়েছিলেন তৃণমূলের রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তাঁদের কোচবিহার থেকে এক পুলিশ অফিসারের সক্রিয় সহযোগিতায় কোচবিহার-২ ব্লকের তৃণমূলের এক নেতা কলকাতায় নিয়ে যান। কলকাতায় গিয়ে গ্রেটারের দুই নেতার সঙ্গে দফায় দফায় তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি থেকে শুরু করে প্রশান্ত কিশোর ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বৈঠক হয়। বিজেপি সূত্রে খবর, সে সময় কার্যত অনন্তপন্থী গ্রেটারদের সঙ্গে তৃণমূলের রফা একপ্রকার নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল।

- Advertisement -

কলকাতা থেকে বৈঠকের পর গ্রেটারের ওই দুই নেতা-নেত্রী কোচবিহারে ফিরে আসেন এবং তারপরই মূল অপারেশন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তৃণমূলের নীচুতলার একাংশ নেতার লাফালাফিতে সেই খবর কোচবিহারে বিজেপির এক গুরুত্বপূর্ণ জেলা নেতার কাছে চলে আসে। দলীয় সূত্রে খবর, এরপরই বিজেপির জেলা নেতৃত্ব যে কোনও মূল্যে অনন্তপন্থী নেতাদের নিজেদের দিকে রাখার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিক ও অসমের মন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা অনন্ত মহারাজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁরা তাঁকে বোঝান। এমনকি মহারাজের মান ভাঙাতে তাঁরা তাঁর বাড়িতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করিয়ে দেওয়ারও কথা দেন। শুধু তাই নয়, ওই বৈঠকের আগে তৃণমূল যাতে কোনওভাবে মহারাজের কাছাকাছি ঘেঁষতে না পারে সেজন্য কার্যত নজরদারি রাখে বিজেপি। সেইমতোই গত বৃহস্পতিবার বঙ্গাইগাঁওয়ে সতীবরগাঁওয়ে অনন্ত মহারাজের বাড়িতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসেন। আর সেই হিসাব মিলিয়ে কোচবিহারে অমিত শার সভা ভরিয়ে দেন অনন্তপন্থী গ্রেটার কর্মী-সমর্থকরা।

রাজনৈতিক মহলের মতে, বিজেপি অঙ্ক কষেই এই কাজ করেছে। কারণ বিজেপির কাছে একটা জিনিস পরিষ্কার, উত্তরবঙ্গে, বিশেষ করে কোচবিহার জেলায়, বিধানসভা নির্বাচনে ভালো ফল করতে হলে প্রধান অস্ত্রই হচ্ছে রাজবংশী ভোট। কোচবিহারে এই রাজবংশী ভোট রয়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। আর এই ভোটারদের সিংহভাগ অনন্তপন্থী। তাই অনন্ত মহারাজকে বিজেপি কোনওভাবেই হাতছাড়া করতে চায়নি। কোচবিহারের সাংসদ নিশীথ প্রামাণিক অবশ্য বলেন, এমন কোনও ব্যাপার নয়। বিজেপি সরকার সবসময় রাজবংশীদের পাশে রয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার রাজবংশী সম্প্রদায়ের উন্নয়ন চায়। রাজবংশী সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ যেহেতু অনন্ত মহারাজের সঙ্গে রয়েছেন সে কারণেই তাঁর সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।

তৃণমূলের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায় বলেন, অনন্ত মহারাজকে ওরা মঞ্চে আনতে পারেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাড়িতে গেলে তো তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তবে, ওই সভায় কোচবিহারের কর্মী-সমর্থকরা আসেননি। উত্তরবঙ্গ ও অসমের কিছু জায়গা থেকে ওরা লোক ভাড়া করে এনেছিল। তাঁদের হাতে গ্রেটারের পতাকা ধরিয়ে দিয়ে ওরা বোঝাতে চেয়েছে রাজবংশীরা ওদের দিকে আছেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। অনন্ত  মহারাজের অনুগামী নীচুতলার গ্রেটার নেতা-কর্মীরা আমাদের সঙ্গে আছেন।