বিপ্লবের নকশালবাড়িতে ভোটেও অনেক রহস্য

119

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, নকশালবাড়ি : একপাশে ধানখেত। তার পিছনে রেললাইন ও নেপাল সীমান্তের দিকে চলে যাওয়া এশিয়ান হাইওয়ের পিছনে মজে আসা ছোট নদী একটি। নাম বাতারিয়া। পিছনে সবুজে সবুজ খেত। গায়ে বেঙ্গাইজোত প্রাথমিক বিদ্যালয়। এই আবহে মাঝখানের মসৃণ পিচ রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় ডানদিকে তাকালে চমকে উঠতে হয়।

পথের ধারে পরপর লাল বেদির উপর সাতটি কালো আবক্ষ মূর্তি। লেনিন, স্ট্যালিন, মাও সে তুং, লিন পিয়াও, চারু মজুমদার, সরোজ দত্ত, মহাদেব মুখোপাধ্যায়ের। পাশে ১৯৬৭ সালে পুলিশের গুলিতে মৃত নয় গ্রামবাসী ও দুই শিশুর শহিদ স্তম্ভ।আজকের রাশিয়া বা চিনে এই নেতাদের এমন সহাবস্থান সম্ভব নয় আর। কিন্তু এই এলাকাটার নাম নকশালবাড়ি।

- Advertisement -

এখান থেকে কয়েশো মিটার দূরে, বাড়ির সামনে গেটের মুখে বসে উননব্বই বছরের বৃদ্ধ বলছিলেন সশস্ত্র বিপ্লবের কথা। জীবনে কোনও দিনও ভোট দেননি। এবারও দেবেন না। বেশি কথা বলতে গেলে মাঝে মাঝেই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয় পবন সিংহের। তার মাঝেই বলছিলেন, বিপ্লব ছাড়া কোনও উপায় নেই। ওটাই একমাত্র রাস্তা। আমি ভোট দিইনি জীবনে। এবারও দেব না।

শহিদ স্তম্ভে সবচেয়ে উপরে যাঁর নাম, সেই ধনেশ্বরীদেবীরই ছেলে পবন। চোখের সামনে দেখেছেন নকশালবাড়িতে সাধারণ মানুষের উপর পুলিশের গুলি চালনার ঘটনা। মায়ের মৃত্যু। নকশাল নেতা মহাদেব মুখোপাধ্যায় তাঁর বাড়িতে শেষদিকে ছিলেন বছরদুয়েক।

এ বাড়ি থেকে আরও একটু এগোনো যাক, মূর্তিগুলো পেরিয়ে দুটো প্রাচীন বট গাছ পাশাপাশি অদ্ভুতভাবে দাঁড়িয়ে সেখানে। নকশালবাড়ি শেষ, শুরু খড়িবাড়ি ব্লক। গ্রামের নাম প্রসাদুজোত।

বিপ্লবের শেষ কথা নকশালবাড়িতে এই একজনকেই পাওয়া গেল, যিনি এখনও ভোট দেন না। সশস্ত্র বিপ্লবের কথা বলেন। পাঁচ কিলোমিটার দূরে হাতিঘিসার সেবদেল্লাজোত গ্রামে কানু সান্যালের টিনের চাল দেওয়া বসতবাড়িতে আরেকজনকে পাওয়া গেল, যিনি বিদ্রোহী মেজাজে। কথা বলে মনে হল, ভদ্রমহিলা এবার নোটাতে ভোট দেওয়ার পক্ষপাতী। দীপু হালদার- কানুবাবুর স্মৃতি সংরক্ষণের যিনি দায়িত্বে।

নকশালবাড়ির বাকি অঞ্চল? শহর থেকে গ্রাম, পাড়ার আনাচে-কানাচে দুই ফুলের পতাকা উড়ে বেড়াচ্ছে ভোটের আগে। পদ্ম যথারীতি বেশি। কানুবাবুর এক সময়ের ছায়াসঙ্গী ছিলেন প্রদীপ দেবনাথ। কানু-জঙ্গল সাঁওতালের বাড়ির দুপা উলটোদিকে তাঁর বাড়ি। অনেকদিনই তিনি তৃণমূলে। শুক্রবার দুপুরে তাঁর বাড়ির সামনে নজরে আসে, দুই ফুলেরই পতাকা। দীপু ওই এলাকায় অন্য কোনও পার্টির পতাকা লাগাতে দেননি। খুলেও ফেলেছেন। কিন্তু নকশালবাড়ি যে আজ বদলে গিয়েছে সম্পূর্ণ।

চারু মজুমদারের ছেলে অধ্যাপক অভিজিৎ থাকেন শিলিগুড়ির মহানন্দাপাড়ায়। দিন দুই আগে তিনি বলছিলেন, নকশাল আন্দোলনের পর নকশালবাড়ির প্রেক্ষাপট কীভাবে পালটে গিয়েছে। ধানের বদলে চা চাষের ভাবনায় চাষি। বাতারিয়া ব্রিজের কাছে শচীন সিংহ নামে এক মধ্যবয়স্ক চাষির সঙ্গে কথা বলে টের পাওয়া যায়, ধান চাষ কতটা কঠিন এখন। ধানে পোকা লাগছে। আগের মতো উৎপাদন নেই। কেউ আর দেখে না, সটান বললেন। তাঁর বাড়ির কাছেও আরও ছয়জনের দুটি শহিদ স্তম্ভ।

যে জোড়া বটগাছের তলায় নকশালবাড়ির গণহত্যা হয়েছিল, তার সামনেও বোরো ধানের খেত। কয়েকজন তরুণ আড্ডা দিচ্ছিলেন। তাঁরা কোনও রাখঢাক না করেই কী বললেন জানেন? আগে তৃণমূল করতেন, কিন্তু এবার ভোট দেবেন বিজেপিকে। কেন? সমবেত কণ্ঠস্বরে তীব্র ক্ষোভ, বৃষ্টি এলেই পুরো বাড়ি ডুবে যায় এলাকায়। এখানকার নেতাদের বলেও কোনও কাজ হয়নি। কিছুই করেনি। শুধু নিজের এলাকা দেখেছে।

সংযুক্ত মোর্চার প্রচারে গ্রাম থেকে বেরোচ্ছিলেন সিপিএমের নেতা রাজু সরকার। ভদ্রলোক কথায় কথায় মেনে নিলেন, এলাকায় বিজেপির বাড়বাড়ন্ত। নকশালবাড়ির বিভিন্ন গ্রামের রাস্তায় ঘুরলে পতাকার সংখ্যাই বলে দিচ্ছে, নকশালদের জন্মভূমি কীভাবে পালটে গিয়েছে। একরকম পদ্মবিপ্লব। বিজেপির উত্থানের তিনটে কারণ দেখাচ্ছেন বিভিন্ন স্থানীয় নেতারা। ১) এই অঞ্চলে আরএসএস অনেকদিন ধরে স্কুল চালাচ্ছে, আড়ালে বাড়িয়েছে সংগঠন। ২) বাংলাদেশ থেকে এসে ঘর বাঁধা হিন্দুরা রাজ্যের বর্তমান ধারাতেই বিজেপির পথে। ৩) তৃণমূলের স্থানীয় নেতাদের দুর্নীতিতে ক্ষোভ তীব্র।

তিনটে কারণের কাছে সব কিছুই আড়ালে চলে গিয়েছে যেন। দার্জিলিংয়ের প্রাক্তন বিজেপি সাংসদ সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া নিজে ২০১৪ সালের নভেম্বরে কানুবাবুর গ্রাম সেবদেল্লাজোতে গিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, এ গ্রাম হবে কেন্দ্রের আদর্শ গ্রাম। সংসদ আদর্শ গ্রাম যোজনা প্রকল্পে।

কোথায়? কিছুই হয়নি। কানুবাবুর বাড়ির পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে ছোট নদী মানঝা। কাদায় ভরা। বৈশাখের শুকনো সেই নদীতেই স্নান করছে, কাপড় ধুচ্ছে স্থানীয় মেয়েরা। পানীয় জলের সমস্যা তো রয়েছেই। ওই শীর্ণ মানঝা নদীর জলের ওপর নির্ভর করতে হয় গ্রামবাসীদের। নেপাল এলাকা কাছে বলে এমনিতেই বেআইনি ব্যবসার রমরমা রয়েছে। চাকরি নেই। বিজেপি নেতার ফাঁকা প্রতিশ্রুতির কোনও প্রভাব ভোটে পড়ছে না।

যেমন পড়ছে না ক্ষমতায় এসে মমতা সরকারের এসব গ্রামের রাস্তা ভালো করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। বেঙ্গাইজোতের রাস্তাই এখন অনেক ভালো। কিন্তু ওখানে বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে স্থানীয় নেতাদের দুর্নীতি। ৫৩ বছর পর নকশালবাড়ির শহর এলাকা জমজমাট, গমগম করছে। সেখানে সিন্ডিকেট দুর্নীতি খুব স্বাভাবিক।

শ্রমিক, কৃষকরা আড়ালে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রামের নকশাল নেতারা কি হারিয়ে গেলেন?  কানুবাবু যে ঘরে আত্মহত্যা করেছিলেন, সেখানেই এখন সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের স্থানীয় কর্তারা সভা করেন। এখনও সেখানে পড়ে রয়েছে তাঁর সাধের টাইপ রাইটার। রান্নাঘরে ধুলো জমেছে তাঁর প্রিয় সাইকেলে। এই প্রশ্নটা শুনে কানুবাবুর অনুগামী দীপু পালটা প্রশ্ন করলেন, তেত্রিশ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সিপিএমের মতো বাম দলগুলোর যখন এই দুরবস্থা, তখন আমাদের দিকে আঙুল তোলা কেন?

উইকিপিডিয়ার হিসেব বলছে, এই মুহূর্তে ভারতে মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট পার্টি অন্তত ২৩টি। দেখলে মাথা গুলিয়ে যাবে। গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বিজেপি-কংগ্রেস-তৃণমূলকেও লজ্জা দেবে। কত তত্ত্ব, কত বিশ্লেষণ। অথচ সমর্থকদের সংখ্যা কমছে। কানুবাবু এত বছর ধরে বিপ্লবের জন্য পড়েছিলেন নকশালবাড়ির এই গ্রামে। অথচ সাত বিপ্লবীর মূর্তি তালিকায় তাঁর মূর্তি নেই। কেননা এর উদ্যোগ নিয়েছিলেন চারু মজুমদারের অনুগামী মহাদেব মুখোপাধ্যায়- কানুবাবুর মতবাদের বিরোধী। কানুবাবুর আত্মহত্যার ১১ বছর হয়ে গেল গত ২৩ মার্চ। কোন অবসাদে তিনি চলে গেলেন, তার মীমাংসা হল না আজও।

কানুবাবুর  কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী- লেনিনবাদী) পুরো ব্যাপারটা গ্রামে তদন্ত করতে পাঠিয়েছিল সর্বভারতীয় নেতাদের। তাঁদের সেই রিপোর্ট এতদিনেও প্রকাশ্যে আসেনি। একমাত্র ঘরে কাঠের সিলিং থেকে ঝুলে পড়েছিলেন কিংবদন্তি নকশাল নেতা। সকাল থেকে কাউকে বুঝতে দেননি। গ্রামে অনেকেই এখনও বলেন, সেদিন তাঁর পায়ের কাছে ছিল একটা ছোট কাগজ। সম্ভবত সুইডসাইড নোট। কে সেটা উধাও করে দিল, তা নিয়ে এত বছর পরেও তীব্র রহস্য।

ভোটগঞ্জের নকশালবাড়িতে আজ ভোটেও পরতে পরতে রহস্য। রহস্যটাই এখন বিপ্লবের নাম।