রায়গঞ্জ মেডিকেলে রক্তের ভাঁড়ার শূন্য, সমস্যায় থ্যালাসেমিয়া রোগীরা

279

রায়গঞ্জ : করোনার আতঙ্ক ছড়িয়েছে রক্তদাতাদের মধ্যেও। সংক্রমণ রুখতে লকডাউনের ফলে রক্তদান শিবির কমে যাওয়ায় রক্তের হাহাকার দেখা গিয়েছে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে। গত কয়েকদিন ধরে মেডিকেলের ব্লাড ব্যাংক কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে। আর এই রক্ত সংকটের সুযোগ নিয়ে দালালরাজ আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে মেডিকেল কলেজ চত্বরে। রক্তের জন্য দালালের পাল্লায় পড়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে মুমূর্ষু রোগীর পরিবারকে। দিন কয়ে আগে রায়গঞ্জের এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার কৌশিক ভট্টাচার্য ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দিতে এসে এক দালালকে হাতেনাতে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেন। সম্প্রতি রায়গঞ্জ থানায় দালালদের খপ্পরে পড়ে একাধিক অভিযোগ দায়ের হলেও মেডিকেলে দালালরাজ অব্যাহত রয়েছে। যদিও ব্লাড ব্যাংকের কর্মীদের সাফ বক্তব্য, বারংবার রোগীর পরিজনদের সাবধান করা হলেও তাঁরা সচেতন হচ্ছেন না। এপ্রসঙ্গে তৃণমূল রোগী পরিষেবা কেন্দ্রের সম্পাদক বাবন সাহা বলেন, সম্প্রতি ব্লাড ব্যাংক ক্যাম্পাসে একাধিক দালালকে ধরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এদের স্বভাব পরিবর্তন হয়নি। বিভিন্ন মাদকে আসক্ত কিছু যুবক নেশার টাকা জোগাড় করতেই রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও ক্যাম্পাসে রক্তের দালালি শুরু করেছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

রায়গঞ্জ মেডিকেলের নোডাল অফিসার বিপ্লব হালদার বলেন, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজে সমস্ত পরিষেবাই বিনামূল্যে দেওয়া হয়। দালালের খপ্পরে রোগীরা যাতে না পড়ে তার জন্য মেডিকেল কলেজ কর্তপক্ষের তরফে প্রচার করা হয়েছে। তারপরেও যদি কোনও রোগী দালালের খপ্পরে পড়ে তাহলে আমাদের কিছু করার নেই। দালালের খপ্পরে পড়ার পর ভুক্তভোগীরা আমাদের কাছে অভিযোগ জানাতে আসে। তখন আমরা থানায় অভিযোগ করার কথা বলি। কিন্তু অধিকাংশ রোগীর পরিজনেরা থানার দ্বারস্থ হন না। ফলে দালালরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে।

- Advertisement -

গত কয়েকদিন ধরে রায়গঞ্জ হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংক কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে। মঙ্গলবার ব্লাড ব্যাংকে ভাঁড়ারে রক্ত ছিল এ পজিটিভ ০ ইউনিট, ও পজিটিভ ০ ইউনিট, এবি পজিটিভ ০ ইউনিট, এ নেগেটিভ ০ ইউনিট, বি নেগেটিভ ০ ইউনিট, ও নেগেটিভ ০ ইউনিট, এবি নেগেটিভ ১ ইউনিট। এর ফলে মুমূর্ষু রোগীরাও রক্ত পাচ্ছেন না। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের রক্তের প্রয়োজন হলেও তা মিলছে না বলে অভিযোগ। সংক্রমণের আশঙ্কায় কমে গিয়েছে রক্তদান শিবির। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বা রাজনৈতিক দলগুলির যুব সংগঠন রক্তদান শিবির আয়োজনে আর আগের মতো উদ্যোগী হচ্ছে না। কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা উদ্যোগী হলেও শিবিরে রক্তদাতার সংখ্যা খুবই কম হচ্ছে।

রায়গঞ্জের এমনই এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার কৌশিক ভট্টাচার্য বলেন, রক্তদাতাদের মধ্যে করোনার আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে। তাছাড়া অনেকে রক্ত দিলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। কেউ কেউ আবার ভিড়ের মধ্যে আসতে চাইছেন না। ফলে রক্তদান শিবিরের আয়োজন করা হলেও রক্ত দিতে নামমাত্র কয়েজন আসছেন। সামান্য জ্বর-সর্দি হলেও কেউ আর রক্তদানে আগ্রহী হচ্ছেন না। শুধুমাত্র উত্তর দিনাজপুর জেলা নয়, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রতিবেশী রাজ্য বিহার থেকেও রোগী আসেন। তাই গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালে রক্তের প্রচুর চাহিদা।

রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ দিলীপ পাল বলেন, আগে একমাসে প্রায় ৫০-৬০টি রক্তদান শিবির হত। করোনা আবহে রক্তদাতার সংখ্যাও কমে গিয়েছে। ফলে ব্লাড ব্যাংকে রক্ত সংকট দেখা দিয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদেরই রক্ত দেওয়া যাচ্ছে না। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে রক্তদান শিবির করার আবেদন করা হয়েছে। হাসপাতালেও প্রতিদিন ৫-৭ জন এসে রক্ত দিতে পারবেন, সেই পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে খবর, যে পরিমাণ রক্তের চাহিদা, সেই তুলনায় জোগান নেই। ফলে অনেক সময় থ্যালাসিমিয়া রোগীদেরও ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এদিকে, রক্তের এই সংকটকালে হাসপাতালে ব্লাড সেপারেশন ইউনিট দ্রুত চালুর দাবি উঠেছে। যদিও লকডাউনের আগেই ব্লাড সেপারেশন ইউনিটের জন্য মেশিনপত্র চলে এসেছে। কিন্তু অজ্ঞাতকারণে এখনও তা চালু হয়নি।

এপ্রসঙ্গে ব্লাড ব্যাংকের এক কর্তা বলেন, রক্তদাতাদের মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। করোনার আতঙ্কমুক্ত করতে রক্তদাতাদের সাহস জোগাতে হবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্লাড সেপারেশন ইউনিটে এক ইউনিট ব্লাড থেকে একাধিক রোগী উপকৃত হতে পারেন। সেপারেশন ইউনিটে রক্তের প্লাজমা, আরবিসি ও প্লেটলেট আলাদা করা যায়। এক ইউনিট ব্লাড থেকেই তিনজন রোগীকে বাঁচানো সম্ভব।