মানিকগঞ্জ : নিজভূমে পরবাসী হওয়ার আশঙ্কায় সিঁটিযে রয়েছে জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের দক্ষিণ বেরুবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের নলজোয়াপাড়ার ১০৫টি পরিবার। ওই গ্রামের একটি জমির দাবিদার ভারত ও বাংলাদেশ। দুই দেশের জমির নকশাতেই ওই ভূখণ্ডের উল্লেখ রয়েছে। ফলে প্রযোজনীয দলিলপত্র হাতে থাকলেও সেখানে চাষ-আবাদ দূরে থাক, ওই ভূখণ্ডের ত্রিসীমানায় যাওযার সাহস পাচ্ছেন না ওই জমির মালিকরা। এমনই এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে নলজোয়াপাড়ায।

স্থানীয বাসিন্দা তথা প্রাক্তন গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সারদাপ্রসাদ দাস জানান, ১৯৯৮ সালে উভয় দেশের সম্মতিতে হাইপাওয়ার কমিটির সার্ভেয়াররা গ্রামটির সীমানা নির্ধারণ করেন। সেই অনুযাযী জিরো পয়েন্টে পিলার বসানো হয়। তাতে ১১, ১২(এখন আর অস্তিত্ব নেই) ও ১৩ নম্বর পিলারের মাঝে পাখির ঠোঁটের মতো বাংলাদেশের ভূখণ্ডের একটি অংশ যমুনা নদীর ধারে দ্বীপের মতো ভারতের মূল ভূখণ্ডের মাঝে অবস্থান করছে। এখানে বাংলাদেশের প্রায ৬ বিঘা জমি রয়েছে। ভারতীযদের অধীনে থাকলেও জমিটি আজও বাংলাদেশের মানচিত্রে রয়েছে। অন্যদিকে, একইভাবে যমুনা নদীর ধারে অবস্থিত ভারতের প্রায় ১৬ বিঘা জমি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে রযে গিয়েছে। তার প্রযোজনীয় নথি ভারতীযদের কাছে থাকলেও জমিটি ইতিমধ্যেই বাংলাদেশ সরকার মিউটেশনের মাধ্যমে নিজ মানচিত্রে তুলে নিয়েছে। ওই জমিতে বাংলাদেশের নাগরিকরা আখ চাষও করছেন। এদিকে, ভারতের দিকে দক্ষিণ বেরুবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ১৯৫৮ সাল থেকে মিউটেশন বন্ধ থাকায় অধিকৃত কোনো জমির মালিকানা পরিবর্তন করা সম্ভব হযনি। ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর পিলার ধরে সীমান্ত সড়ক ও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হলে নলজোয়াপাড়া গ্রামের ১০৫টি পরিবার সহ প্রায় হাজার বিঘা চাষের জমি কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে চলে যাবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ওই ১৬ বিঘা ভারতীয জমির মতো বাংলাদেশের প্রায় ৬ বিঘা জমি ভারত অধিগ্রহণ করলে এই সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করা যাবে। সেক্ষেত্রে ১১ ও ১২ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলারের আর অস্তিত্ব থাকবে না। ১৩, ১৪ ও ১৫ নম্বর আন্তর্জাতিক সীমান্ত পিলার ধরে সীমান্ত সড়ক ও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হবে। এতে পুরো গ্রাম তারবন্দি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

নলজোয়া গ্রামের বাসিন্দা মলিনচন্দ্র রায, সুনীলচন্দ্র রায জানান, স্বাধীনতার পর তাঁদের এলাকার নাম ভারতের মানচিত্রে ছিল না। ছিটমহল বিনিময় চুক্তি হওযার পর নলজোয়াপাড়া এদেশের মানচিত্রে স্থান পায়। এরপর উভয দেশের সম্মতিতে হাইপাওয়ার কমিটির সার্ভেযাররা গ্রামটির সীমানা নির্ধারণ করেন। সেই অনুযাযী গত দুই বছর আগে আন্তর্জাতিক পিলারও বসানো হয। কিছুদিন পরই সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্তের রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু হবে। স্থানীয় বাসিন্দা হৃষিকেশ রায বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা, সীমান্তের জিরো পযে্ট থেকে প্রথমে ১৫০ মিটার ও সেখান থেকে রাস্তার জন্য আরও ৬০-১০০ মিটার করে জায়গা রাস্তা নির্মাণের জন্য নেওয়া হলে পুরো গ্রামটি বেড়ার ওপারে চলে যাবে। তখন আমাদের স্বাধীনতা বলতে কিছু থাকবে না। বিএসএফ জওয়ানদের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হবে।’ নলজোয়াপাড়ার বাসিন্দা সুমিত্রা রায়, শকুন্তলা রায়, মিনা রায় জানান, আশঙ্কা সত্যি হলে নিজের জমি থেকেই উৎখাত হতে হবে তাঁদের। অথচ এর হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায রয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, প্রশাসন সঠিক পদক্ষেপ করলে গ্রামকে কাঁটাতারের বেড়ায বন্দি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। এই দাবি নিযে জলপাইগুড়ির সাংসদ জয়ন্ত রায়ের দ্বারস্থ হন গ্রামবাসীরা। সম্প্রতি ওই এলাকায গিযে বিষযটি সরেজমিনে দেখেন জয়ন্তবাবু। স্থানীয বাসিন্দাদের সঙ্গে কথাও বলেন। চলতি অধিবেশনে বিষয়টি সংসদে তোলার আশ্বাস দেন সাংসদ।