ভোট প্রচারে আসেন না কোনও প্রার্থী, তবু ভোট দেয় সীমান্তগ্রাম রসাখোয়া

95

বিশ্বজিৎ সরকার,  রসাখোয়া : ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের এপারে একফালি ভূখণ্ড উত্তর দিনাজপুরের রসাখোয়া। দিনে তিনবার ঘণ্টা তিনেকের জন্য সীমান্তের দরজা খোলা হয়। রাত ৮টার পর সব বন্ধ। সেই রসাখোয়া গ্রামেই প্রায় ২০০ ঘরে প্রায় সাড়ে ৭৫০ ভোটার। ভোট এলেও এই গ্রামে কোনও মিটিং-মিছিল নেই। কোনও ভোট প্রচার নেই। প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মতোও কেউ নেই। বিধানসভা ভোট ঠিক কয় দফায় হচ্ছে, তা-ও জানেন না অনেকেই। উত্তর দিনাজপুরেই বা কবে ভোট, তা-ও নিশ্চিত করে জানেন না এখানকার মানুষ। কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের কাছে পৌঁছতে পারেন না রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। মূলত সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর নানা নিয়মের কারণেই প্রার্থীরা সেখানে প্রচারে যেতে পারেন না। কিন্তু কাঁটাতার পেরিয়ে এসে ভোট দেন সেইসব নাগরিকরা। অথচ তাঁদের এলাকার সমস্যার কথা তাঁরা প্রার্থীকে জানাতে পারেন না। এই আক্ষেপেই ভুগছে করণদিঘির সীমান্ত লাগোয়া রসাখোয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় ছয় হাজার পরিবার। কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে বিএসএফের নিয়ম মেনে দেশের অন্যত্র যাতায়াত করেন ওইসব এলাকার বাসিন্দারা। ভোট হোক বা কোনও উৎসব, এই নিয়মের কোনও পরিবর্তন হয় না। দেশের বাসিন্দা হলেও চিড়িয়াখানায় বন্দি পশুর মতোন জীবন তাঁদের। রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেন, সীমান্তের কাঁটাতারের গেটে কর্তৃব্যরত জওয়ানদের ভোটের কার্ড দেখালে ওপারের গ্রামে যাওয়ার অনুমতি মেলে। কিন্তু দিনের যে সময়ে গেট খোলা হয় শুধুমাত্র সেই সময়ে নিয়ম মেনে যাতায়াত করতে হয়। ভোটের সময় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা কোথাও বসে থাকার ফুরসত পান না। সেখানে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে গিয়ে একটা দিন আটকে থাকার মতো সময় নেই কোনও প্রার্থীর। কাজেই কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে প্রার্থীদের যাওয়া সম্ভব হয় না।

মাটির দাওয়ায় বসে রেডিয়োয় গান শুনছিলেন রেনেসাঁ খাতুন। ভোটের কথা বলতেই ক্ষেপে গেলেন। বললেন, এখন অনেক মানুষ আসবেন। ভোটে জেতার জন্য অনেক নাটক করবেন। কিন্তু বন্দি জীবন থেকে উদ্ধার করতে কে এগিয়ে এসেছেন? জমিতে জল দিছিলেন সদ্য ভোটাধিকার পাওয়া আলমগীর হোসেন। ভোটের কথা বলতেই তাঁর গলাতেও চড়া সুর। বললেন, আমাদের আবার কীসের ভোট? আমরা তো বদ্ধভূমির বাসিন্দা। আমাদের দিকে কারও নজর নেই। বাজার করে পথে বন্ধুর সঙ্গে দুটো কথা বলতে গিয়ে রাত নটা বেজে যায় রহিমুদ্দিনের। সেদিন নিজের বাড়িতে ঢুকতে পারেননি তিনি। রহিমুদ্দিন বলেন, রাত ৮টা বেজে গেলে আর ঘরে ফেরার উপায় থাকে না। বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছেও বিএসএফ জওয়ানদের কড়াকড়িতে রাস্তাতেই রাত কাটাতে হয়। নিজের বাসভূমিতেই জেলখানার জীবন কাটাতে হয় আমাদের।

- Advertisement -

স্থানীয় বাসিন্দা মইনুদ্দিন মহম্মদ বলেন, আমাদের এলাকায় কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এখনও পর্যন্ত ভোটের প্রচারে আসেননি। স্থানীয় নেতারাই প্রতিটি নির্বাচনে আসেন। প্রার্থীদের কাছে আমাদের সমস্যার কথা জানাতে পারি না। আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলছেন, প্রার্থীরা এলাকায় এলে তাঁদের সামনে সমস্যাগুলো তুলে  ধরতাম। কিন্তু এখানে তো কেউই আসেন না।

করণদিঘির তৃণমূল প্রার্থী গৌতম পাল বলেন, সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে যাঁরা বসবাস করেন তাঁদের সমস্যা আমরা জানি। তাঁদের সঙ্গে এই নিয়ে কথাও হয় আমাদের। সীমান্তের নিয়মের কারণে বেড়ার ওপারে যাওয়া সম্ভব হয় না ঠিকই, তবে বাসিন্দাদের এপারে নিয়ে এসে সভা করা হয়েছে। করণদিঘির বিজেপি প্রার্থী সুভাষচন্দ্র সিনহা  বলেন, সীমান্ত এলাকার নিয়ম সবাইকে মানতে হয়। এই কারণে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে প্রার্থীর পক্ষে যাওয়া সম্ভব হয় না। তবে আমরা স্থানীয়দের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। তিনি বলেন, তৃণমূলের জমানায় কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে থাকা মানুষের উন্নয়ন হয়নি। আমরা ক্ষমতায় এলে ওপারের গ্রামগুলির পরিকাঠামোর উন্নয়ন করব।