কাঁটাতার, সাবেক ছিটে ভোট আজও আনন্দের

55

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, সিতাই : ভোটরঙ্গের বোমা, গুলি, ছুরি ও উত্তেজনার মাঝে ওই দুটি দৃশ্য চোখের পক্ষে বড় স্নিগ্ধ। মনোরমও। কোচবিহারের দুই চরম উত্তেজনাপূর্ণ শহরের কাছাকাছি সীমান্তবর্তী গ্রামাঞ্চলের ছবি।
প্রথমটি সিতাই বিধানসভায় পড়বে। কাঁটাতারের বেড়ার ঠিক পাশে নির্জন পিচ রাস্তায় ধান ও গম শুকোতে দেওয়া রয়েছে রোদে। মাঝে মাঝে মোবাইল কানে গৃহিণী সেসব পা দিয়ে নাড়িয়ে আসেন। পাশে ঘোরাঘুরি করেন দুই ভাই ইন্দ্রজিৎ বর্মন, উজ্জ্বল বর্মন। প্রথম জন এমএ পড়েন ইতিহাস নিয়ে, দ্বিতীয় জন বিএ।
দ্বিতীয়টি শীতলকুচি বিধানসভার অংশ। সবুজে নলগ্রামে একটি বাড়ির সামনে বিশাল বাগান। নারকেল-ছায়ায় পাশাপাশি চেয়ারে বসে হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের পাঁচজন। বাইরের সাংবাদিকের অপেক্ষায়। ছিটমহলে থাকার সময় এঁরা ছিলেন কার্যত নো ম্যানস ল্যান্ড-এর বাসিন্দা। পাঁচ বছর আগে প্রথম ভোট দিয়েছিলেন। এবার জেলায় যেখানে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্ব নিঃশব্দে চরমে, সেখানে সাবেক ছিটের এঁরা পাশাপাশি চলতে চান। কে কাকে ভোট দেবেন, নিজেদের ব্যাপার।

আবার ফিরে যাই সিতাইয়ের গ্রামে। সিতাই মোড় থেকে অজস্র খেত, আলপথ পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় সেখানে। হাঁস, বাছুরের দল খেলা করে স্নিগ্ধ বর্ধিষ্ণু গ্রামে। দুপা গেলেই কাঁটাতার চলে গিয়েছে দুচোখ যেদিকে যায়। এই পরিবেশ থেকে বহু দূর যাতায়াত করে এমএ পর্যন্ত পড়া বিশাল ব্যাপার। একান্নবর্তী পরিবারের বড় ছেলেটির চোখে এখন অনেক স্বপ্ন।

- Advertisement -

সীমান্ত একেবারে গায়ে ওপরে উঠে এসেছে বলে কি সমস্যায় পড়েন? বাড়ির কর্তা সুশীল বর্মন সটান বলেন, আমাদের পুরোটা হিন্দু গ্রাম বলে সমস্যা নেই। এই একটা কথাই অনেক কিছু বলে দেয় যেন। বাংলাদেশ সীমান্তের এই দিকে হিন্দু-মুসলিম এক গ্রামে থাকলেই সমস্যা। ভোটের আগে ঝামেলায় ইন্ধন দেন অনেক নেতা। কাগজে নিয়মিত শীতলকুচি, সিতাইয়ে সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায় এজন্যই।

শীতলকুচিতে সাবেক ছিটমহলের গ্রামে গেলে আর বোঝার উপায় নেই যে, জায়গাটা আদৌ ভারতের ছিল না। গ্রামের একটা রাস্তা দিয়ে তামাকখেতের আলে নামতেই শুনলাম, এই জায়গাটা সীমানা ছিল এঁদের। আপনাদের প্রধান সমস্যা কী এখন? নলগ্রামের কাছে আরেকটা ছিট-গ্রাম রয়েছে। নাম ফলনাপুর। গোল হয়ে বসা গৌতম বর্মন, শাহিনুর রহমান, খলিল মিয়াঁ, রঞ্জিত বর্মন, নিরঞ্জন বর্মনের কথাবার্তায় বারবার উঠে আসছিল দুটো জায়গার তুলনা। ছিটমহল বিনিময়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় তাঁদের নানা আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। অধিকাংশই পূরণ হয়নি। এখনও জলসমস্যা মেটেনি। গভীর নলকূপ খুব কম। পাশের সাবেক ছিট ফলনাপুরে রাস্তাঘাট যা হয়েছে, নলগ্রামে তা-ও হয়নি।

চাহিদা এঁদের খুব কম। সিতাইয়ের বর্মন পরিবার যেমন। অনেকটা আলপথ ভেঙে গ্রামে ঢুকতে হয়, তবু পিচের রাস্তার জন্য তেমন হা-হুতাশ নেই। এত দূরে পড়াশোনা করতে যেতে হয় বলেও সমস্যা মনে করেন না। নলগ্রামের পাঁচ বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলার সময় দূরের রাস্তা দিয়ে তীব্র শব্দে হুটার বাজিয়ে বিজেপি প্রার্থীর কনভয় চলে যায়। সিতাইয়ের গ্রামে তেমন ভোট-হাওয়া নেই। বর্মনদের বড় বাড়ির দেওয়ালে দুটো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে পোস্টার কেউ লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছে।

বাড়ির একেবারে গা ঘেঁষে কাঁটাতারের বেড়া চলে যাওয়ায় সমস্যা হয় না? প্রশ্ন করার সময় খেয়াল করি, বিস্তৃত অঞ্চলে সীমান্তরক্ষীদের দেখা নেই। যত খুশি তোলা যায় ছবি। কাঁটাতারের ঠিক ওপারেই চাষবাস চলছে। এক মহিলা মাথায় বিস্তর কাঠ নিয়ে ঘুরছেন। বর্মন ভাইরা বললেন, ওপারে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁরা সবাই এপারের লোক। আমরাও যাই মাঝে মাঝে। একটা নির্দিষ্ট সময়ে গেট খোলে, বন্ধ করে। আসল সীমান্ত এখান থেকে অনেকটা দূরে। নদীর ওপারে। নদী মানে সেই সিঙ্গিমারি। জলঢাকারই আরেক নাম, মানসাইয়ের মতো। সিঙ্গিমারিই কোচবিহারের মানচিত্রের নীচে হয়ে উঠেছে অঘোষিত ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত।

সিতাইয়ে মোড় থেকে এই বাড়ি আসতে আসতে খেতের কোণে এক প্রবীণার সঙ্গে দেখা। বসে আছেন। পাশে দুই তরুণ কাজ করছেন। হয়তো বৃদ্ধার আত্মীয় হবে। বৃদ্ধা কোনওমতেই বলতে চাইলেন না, ভোট কাকে দেবেন, ভোটের হাওয়াই বা কী। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা, এসব অচেনা লোকদের কিছু বলা উচিত নয়। ঝামেলা হবে।তিনি কোনও কথা বলতে চাইলেন না।

কথা না বলার আরও একটা জায়গা রয়েছে ভোটের কোচবিহারে। আরও একটু পশ্চিমে সরে গেলে। সেখানে সরকারিভাবেই কোনও কথা চলে না।তিনবিঘা করিডর। দহগ্রাম থেকে পাটগ্রাম-বাংলাদেশের এদিকের লোক ওদিকে যাচ্ছেন ভ্যান, টোটো, বাইক, গাড়িতে। সেখানে পেঁছে দেখা গেল, ভারতের ছোট্ট আয়তাকার রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বাংলাদেশিদের কারও মুখে কোনও কথা নেই।
-কী কত্তা কেমন আছেন?
-ভালো আছি গো, তোমাদের এখানে ভোটের খবর কী?

এ জাতীয় কথাবার্তা হতেই পারত। ওদেশে মমতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অগাধ কৌতহল। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের কাছে ফোনে শুনি, পদ্মাপারের অধিকাংশ লোকই চান, মমতা থেকে যান ক্ষমতায়। ছোঁয়া যায়, এমন দূরত্বের মধ্যে দিয়ে চলে যাচ্ছেন বিদেশি লোকগুলো। কিন্তু কোনও পক্ষই কথা বলেন না। কেমন একটা সম্ভ্রম, কেমন একটা ভয়। বাংলাদেশিরা একসঙ্গে অনেকে গাড়িতে গেলেও ঠিক এই জায়গায় এসে কথা বন্ধ। এই এলাকার কাছাকাছি ভোটের কোনও পোস্টারও নজরে এল না।

ভোটচর্চা বরং চলছিল তিনবিঘা করিডর থেকে কিছু দূরে, বড় রাস্তায় চায়ের দোকানে। আশ্চর্য কাণ্ড। মেখলিগঞ্জ থেকে প্যাসেঞ্জার এলে জায়গাটার নাম বলে ছয় মাইল। উলটো দিক থেকে এলে বলা হয় তিন মাইল। সেখানে অবধারিত তর্কের কেন্দ্রে মমতা এবং মোদি। দুই প্রবীণ প্রতিবেশীর ঝগড়াই লেগে গেল ভরসন্ধ্যায়, প্রগাঢ় অন্ধকারে। যদিও তাঁদের কাছে আসল ভোট মানে পঞ্চায়েত নির্বাচন। এক বৃদ্ধের সাফ যুক্তি, ওই নির্বাচনে পাড়ার পরিচিত লোক প্রার্থী থাকেন। তাঁদের নিয়ে জোর আড্ডা দেওয়া যায়। ঠিক তখনই বোঝা গেল, ভোট মানে সত্যি সত্যি আনন্দোৎসব।