দুটি কিডনিই বিকল, বাবাকে বাঁচাতে মরিয়া লড়াই মেয়ের 

393

রাঙ্গালিবাজনা: টেনেটুনে চালানো সংসারেও একমাত্র মেয়েকে কলেজে যাওয়ার জন্য একটা স্কুটি কিনে দিয়েছিলেন মোসলেম আলি। আড়াই বিঘা জমিতে চাষাবাদ করেই চলত সংসার। কিন্তু এক বছর আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। গোটা শরীর ফুলে যায়। এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় গত বছরের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় পরীক্ষা করে জানতে পারেন দু’টো কিডনি অকেজো হয়ে গিয়েছে। শুরু হয় চিকিৎসা। পাশাপাশি চলতে থাকে ডায়ালিসিস। চিকিৎসার খরচ জোটাতে নাজেহাল হয়ে বিক্রি করতে হয় জমিজমা সবই। বর্তমানে নিঃস্ব হয়ে পথে বসার জোগাড় হয়েছে মোসলেমের। বাড়িতে বিক্রি করার মত রয়েছে মেয়ের স্কুটিটা। বাবাকে বাঁচাতে স্কুটিটাও বিক্রি করতে চায় তাঁর কলেজ পড়ুয়া মেয়ে মিম। কিন্তু তারপর? মোসলেমের কাতর আবেদন, ‘আমি বাঁচতে চাই। কেউ আমাকে সাহায্য করুন।’

প্রতিবেশীরা জানান, বাবাকে বাঁচাতে আপ্রাণ লড়ে যাচ্ছে তাঁর মেয়ে মিম নিগার সুহানা। কারণ, লকডাউন শুরু হওয়ার পর মোসলেমের ডায়ালিসিস প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট থানার মধ্য রাঙ্গালিবাজনার বাসিন্দা মোসলেম জানান, প্রথম প্রথম গাড়ি রিজার্ভ করে সপ্তাহে দু’দিন করে আলিপুরদুয়ারে যাতায়াত করছিলেন তিনি। কিন্তু একসময় গাড়ি রিজার্ভ করার মত আর্থিক সঙ্গতি হারান তিনি। আবার লকডাউনের জেরে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় আসল লড়াই। বাবাকে স্কুটির পেছনে চাপিয়ে লকডাউনের সময় সপ্তাহে দু’দিন করে ৬০ কিমি পথ পাড়ি দিয়ে আলিপুরদুয়ার শহরে যাতায়াত শুরু করেন মিম। পাকা রাস্তা ধরে বক্সার জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সপ্তাহে দু’দিন  ১২০ কিমি করে পথ পাড়ি দিয়ে বাবার ডায়ালিসিস চালিয়ে যান তিনি। পরে বাস চলাচল শুরু হলে বাসেই আলিপুরদুয়ার যাতায়াত শুরু করেন মোসলেম। এখনও সপ্তাহে দু’দিন করে ডায়ালিসিস করাতে হয়। তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে খুব অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রতিবেশীর গাড়ি চেয়েচিন্তে নিয়ে যাই। হাতে টাকা নেই। মেয়েটা স্কুটিটা বিক্রি করতে চাইছে। কিন্তু তারপর কি হবে? আর কিছু বিক্রি করার মত আমাদের নেই।‘

- Advertisement -

তাঁর স্ত্রী বেলী খাতুন বলেন, ‘প্রতিবেশী থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। কিন্তু তাতে তো চিকিৎসার খরচ জোগাড় হচ্ছে না। কোনও ইনজেকশনের এক একটির দাম ১৭০০ টাকা, কোনও টির ৫০০ টাকা।‘ মোসলেম আলির আত্মীয় শাকিল হোসেন বলেন, ‘মোসলেমের মেয়েটি ছেলেদের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। ওর লড়াই দেখে আমরা অবাক হয়ে গিয়েছি। তবে পরিবারটির আর্থিক অবস্থা সংগীন। কোনও সহৃদয় ব্যক্তি বা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে হয়ত বা অসুস্থ মানুষটি বেঁচে যাবেন।‘ রাঙ্গালিবাজনা গ্রাম পঞ্চায়েতের স্থানীয় সদস্যা বানো বেগম বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে যেটুকু সহযোগিতা করা সম্ভব করার চেষ্টা করছি।‘ বীরপাড়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মিম বলেন, ‘লকডাউনের সময় রাস্তায় অনেকবার পুলিশ আটকে কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি জিজ্ঞেস করেছিল। বাবার ডায়ালিসিস করার কথা শুনে আর দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু বাবা তো অনেকদিন ধরে কাজ করতে পারে না। বাড়িতে টাকা পয়সা নেই। তাই ভাবছি স্কুটিটা বিক্রি করে দেব। কিন্তু তারপরও তো অনেক টাকা দরকার।‘