মায়ের কথা রাখতে পেরে খুশি লভলিনা

টোকিও : টোকিও-র মঞ্চ আগের দিন সাক্ষী থেকেছে মহাতারকার ছিটকে যাওয়ার। চোখের জলে বিদায় নিয়েছেন এমসি মেরি কম। ২৪ ঘণ্টা পর সেই টোকিও-র বক্সিং মঞ্চে নতুন করে স্বপ্ন দেখা শুরু। সেই স্বপ্নের নাম লভলিনা বড়গোহাইঁ।

অসমের গোলাঘাট জেলার ছোট্ট গ্রাম বারোমুখিয়া। সেখানে এক দরিদ্র পরিবারে অভাব অনটনে বেড়ে ওঠা লভলিনার। ছোটবেলায় দুই যমজ দিদি লিচা ও লিমার মতো কিক বক্সার হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন মুয়াই থাইয়ের (থাই বক্সিং)। বয়স তখন বারো কি তেরো। একদিন দুই দিদির সংগ্রহ থেকে পেয়েছিলেন একটুকরো কাগজ। খবরের কাগজের সেই পাতা জুড়ে শুধুই মহম্মদ আলির ছবি।

- Advertisement -

সেটা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন কোচ পদম বোড়োর কাছে। আজও সময় পেলে আলি-র ভিডিও দেখেন লভলিনা। সেটাই তাঁকে বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগায় রিংয়ে নামার আগে। সেই কথাই একনিশ্বাসে বলে যান কোচ পদম। তাঁর হাতেগড়া ছাত্রী টোকিও থেকে পদক জিতে ফিরুক, সেই প্রার্থনাই একনাগাড়ে করে চলেছেন সাইয়ের প্রাক্তন কোচ।

লভলিনার জীবনের গল্পটাও কম আকর্ষক নয়। বারোমুখিয়ায় ছোট্ট ব্যবসা টিকেন বড়গোহাইঁয়ের। তাতে সংসার চলে না। বাধ্য হয়ে স্থানীয় চা-বাগানে মাসিক ২৫০০ টাকায় কাজ করতে হয়। দুই যমজ কন্যা আর স্ত্রী মামনিকে নিয়ে তাই অভাব অনটনের সংসার। স্বাধীনতা লাভের পঞ্চাশবছর পূর্তি, সেই ১৯৯৭-র ২ অক্টোবর জাতির জনকের জন্মদিবসে বড়গোহাইঁ পরিবারে জন্ম লভলিনার।

এবারও মেয়ে নাক সিঁটকে উঠেছিল গোটা গ্রাম। উপেক্ষা বিরুদ্ধে অবজ্ঞায় জবাব যেন লেখা হয়ে গিয়েছিল কালের নিয়মে। সেই স্মৃতি উসকে লভলিনা বলেছেন, গোটা গ্রামের মানুষ আমার বাবা-মাকে কথা শুনাতো। তাঁদের কোনও ছেলে ছিল না। শুধু তিন মেয়ে আমার মা সবসময় আমাদের উৎসাহিত করতেন ভালো কিছু করে নিন্দুকদের ভুল প্রমাণ করার জন্য। আজ আমরা তা করে দেখিয়েছি।

তবে সুখের দিনেও বড়গোহাইঁ পরিবারে দুঃখের চোরাস্রোত। কয়েকবছর ধরে অসুস্থ লভলিনার মা। গতবছর কলকাতায় তাঁর কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। সেই সময় মায়ে শ্রুশ্রষাতে দিনরাত এক করেছেন ভারতীয় বক্সার। সংক্রামিত হয়েছিলেন করোনায়। ছেদ পড়েছিল অলিম্পিকের প্রস্তুতিতে। তবু লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। এমন মেয়েদের নিয়ে গর্ব হওয়াই স্বাভাবিক। লভলিনার বাবা টিকেনের কথায়, লোকে বলে ছেলেরা বংশের কৌলিন্য বজায় রাখে। তবে আমি আমার তিন মেয়েকে নিয়ে গর্বিত। ওরা ছেলের তুলনায় কোনও অংশে কম নয়।

সঙ্গে যোগ করেছেন স্ত্রী-র অসুস্থতায় ছোট মেয়ে লভলিনার আত্মত্যাগের কথা। বলেছেন, ওর মায়ে দুটো কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সেইসময় অবস্থা গুরুতর ছিল। সারারাত জেগে দিনের পর দিন ও মায়ের সেবা করে গিয়েছে। আমার ছোটমেয়ে এই সংসারের মেরুদণ্ড। আমার স্ত্রীকে নতুন জীবন দিয়েছে। টোকিও-র পদক ওর মায়ের আরোগ্যে পথ্যের কাজ করবে। ওর হাতে পদক দেখলে আমার স্ত্রী তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে। বলার সময় চোখের জল বাঁধ মানছিল না টিকেনের।

একসময়ের তাচ্ছিল্যই যে আজ গোটা গ্রামের গর্বের মণিহার!