বই ছেড়ে ভিক্ষের ঝুলি হাতে ভাই-বোন

115

সৌরভকুমার মিশ্র, হরিশ্চন্দ্রপুর : বাবা ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র। মা অসুস্থ অসহায়। তাই ওদের যখন বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়স তখন ওরা পেটের খিদের তাগিদে রাস্তায় নেমে ভিক্ষাবৃত্তি করছে। ওরা দুই স্কুলপড়ুয়া। ওদের নাম রিংকি মাহারা (১১) ও করণ মাহারা (৯)। ওদের বাড়ি হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের সুলতাননগর গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মিশরপাড়া গ্রামে। বাবার নাম ফেকু মাহারা, মা রীতা মাহারা। এই দুই ভাইবোন সপ্তাহের বেশিরভাগ দিন হরিশ্চন্দ্রপুর পঞ্চায়েত এলাকায় দোকানে-দোকানে এবং পথচলতি মানুষের কাছে ভিক্ষে করে। শনিবার স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ী এদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ওঠে আসে মর্মস্পর্শী ঘটনা।

রিংকি ও করণ জানায়, তারা দুই ভাই ও এক বোন। বহুদিন হল ওদের বাবা মাকে ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। তারা শুনছে বাবা ফের বিয়ে করে সংসার পেতেছেন। আর খোঁজ নেয় না তাদের। তাদের মা রীতাদেবী অসুস্থ। মাঝে মাঝে মাও অন্যত্র কাজের খোঁজে যান। তারা স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করত। কিন্তু স্কুলে তো একবেলাই খেতে দেওয়া হয়। তাই পেটের তাগিদে বইখাতা তুলে ভিক্ষের ঝুলি তুলে নিতে হয়েছে হাতে। তাদের কোনো জমিজমা নেই। তাই ভিক্ষাবৃত্তিকে সম্বল করে জীবনধারণ করতে হচ্ছে।

এদিকে, হরিশ্চন্দ্রপুর পঞ্চায়েত এলাকায় এদের ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখে হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের তৃণমূলের প্রাক্তন সহসভাপতি রুহুল আমিন দুই ভাইবোনকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। তিনি জানান, এই দুটি শিশুকে জীবনের মূল স্রোতে ফেরাতে তিনি অতিরিক্তভাবে উদ্যোগ নেবেন। শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি করাটা সভ্য সমাজের কাছে কলঙ্ক। এই বয়সটা পড়াশোনা ও খেলাধুলো করার। সরকার সমস্তরকম পরিকাঠামো তৈরি করেছে। তাদের মাকে বোঝানো হবে যাতে এদের ভিক্ষাবৃত্তি করতে না দেওয়া হয়। এর সঙ্গে হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের বিডিওকে অনুরোধ করবেন যাতে এই বাচ্চা দুটির কোনো ভালো ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি শিশুকে দায়িত্ববান নাগরিক হিসাবে গড়ে তোলাটা প্রশাসনের কর্তব্য বলে জানালেন রুহুলবাবু।

এপ্রসঙ্গে হরিশ্চন্দ্রপুর-২ ব্লকের বিডিও প্রীতম সাহা জানিয়েছে, তিনি বিষয়টি শুনেছেন। অবিলম্বে বিষয়টি খতিয়ে দেখে পরিবারটির পাশে দাঁড়াবে প্রশাসন। দুস্থ অসহায়দের জন্য যে প্রকল্পগুলি সরকারের আছে সেখান থেকে অর্থ সাহায্য করা হবে। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য যে সমস্ত প্রকল্পগুলি আছে তার আওতায় তাদের আনা হবে। এপ্রসঙ্গে হরিশ্চন্দ্রপুর দক্ষিণ চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শক তারক মণ্ডল জানান, অবিলম্বে এই দুই শিশুকে বয়স অনুযায়ী নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে ভরতি করার ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষা দপ্তর থেকে কোনো সুয়োগসুবিধা তাদের দেওয়া যায় কিনা তা দেখা হবে।

এদিকে সুলতাননগরের মিশরপাড়ার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক জাহির খান জানান, এই পরিবারটি বহুদিন ধরে অসহায় অবস্থায় আছে। বিদ্যালয় থেকে চাল, পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে তিন ভাইবোনকে সাহায্য করা হয়েছে। করণ মাহারা বর্তমানে দক্ষিণ মুকুন্দপুর প্রাথমিক স্কুলের ছাত্র। তার দিদি ও বড়ো দাদা দুইজনেই মানুসিকভাবে একটু দুর্বল। তারা দুজনেই ভিক্ষা করে। ছোটোভাই করণও তাদের সাথে ভিক্ষা করতে চলে যায়। বিদ্যালয় তরফে তাদের মাকে বহুবার বোঝানো হয়েছে। কিন্তু দারিদ্রতা এই পরিবারটিকে বাধ্য করেছে ভিক্ষাবৃত্তির রাস্তায় নামতে। প্রশাসনকে তিনি অনুরোধ করছেন, যাতে এই পরিবারটির পাশে তাঁরা দাঁড়ান।