বর্ধমানে অবাধে চলছে নাড়া পোড়ানো, উদ্বিগ্ন পরিবেশবিদরা

289

বর্ধমান: বেপরোয়া মনোভাব দেখিয়ে চলেছে চাষিরা। কৃষি ও পরিবেশ দপ্তরের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পূর্ব বর্ধমান জেলার সর্বত্র অবাধে চলছে চাষের জমিতে নাড়া পোড়ানো। এরফলে পরিবেশ দূষণ যেমন বাড়ছে তেমনই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে জমিতে থাকা উদ্ভিদের খাদ্য উপাদান। এই ঘটনায় রীতিমত উদ্বিগ্ন কৃষি ও পরিবেশবিদরা।

রাজ্যের শস্যগোলা বলে পরিচিত পূর্ব বর্ধমান জেলা। পূর্ব বর্ধমান জেলার চাষীদের বিশ্ব উষ্ণায়ন ও পরিবেশ দূষণ রোধে হাজারো সচেতনতা প্রচার চালান হলেও সচেতন হতে চাইছেন না তারা। শীত পড়তেই জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে আমন ধান কাটা ও ঝাড়ার কাজ। হারভেস্টার মেশিন দিয়ে আমন ধান কেটে ধান ঝেড়ে নেওয়ার পর এই জেলার চাষিরাও অবশিষ্ঠাংশ অর্থাৎ ‘নাড়া’ জমিতেই পোড়াচ্ছেন। ‘নাড়া’ পোড়ানো বেআইনি ঘোষণা হওয়া সত্ত্বেও চাষিরা বেপরোয়া ভাবেই জমিতে ‘নাড়া’ পুড়িয়ে যাচ্ছেন। এদিকে জমিতে নাড়া পোড়ানো বন্ধে লাগাতার সচেতনতা প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে জেলার কৃষি দপ্তর। কিন্তু হাজারো সচেতনতা প্রচার সত্ত্বেও সচেতন হতে চাইছেন না চাষিরা। জেলার সর্বত্রই চলছে অবাধে ‘নাড়া’ পোড়ানো। পরিবেশবিদরা বলছেন, জমিতে ‘নাড়া’ পোড়ানোর রেওয়াজ চাষিরা বন্ধ না করলে আগামিদিনে দিল্লির পুনরাবৃত্তি বর্ধমান সহ গোটা রাজ্যে ঘটবে। বাংলার গ্রামীণ এলাকা দূষণের ধোঁয়াসায় ঢাকা পড়াটা শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

- Advertisement -

ক্ষেত মজুরি বৃদ্ধি ও একই সঙ্গে ক্ষেত মজুর সংকটের কারণে হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা ঝাড়ার রেওয়াজ তৈরি হয়েছে বর্ধমান জেলায়। জামালপুরের চাষি ভক্তি ধারা বলেন, ক্ষেত মজুর দিয়ে জমির ধান যখন কাটা হয় তখন কাটা ধানগাছ অঁটি বাঁধা অবস্থায় থাকে। ধান ঝাড়ার পর খড়ের অঁটি স্তরে স্তরে সাজিয়ে ‘পালুই’ তৈরি করে তা রাখা হয়। হারভেস্টার মেশিনে ধান কাটা ঝাড়া হওয়ায় সে পরিস্থিতি আর থাকছে না। অজ্ঞ চাষিরা পরিবেশের পাশাপাশি নিজের জমির ক্ষতি করে জমিতেই নাড়া পুড়িয়ে দিচ্ছে। কলকাতা হাইকোর্টের সিনায়র আইনজীবী জয়দীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘প্রশাসন জমিতে নাড়া পোড়ানো বেআইনি ঘোষণা করেছে। কিন্তু আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যারা জমিতে নাড়া পোড়াচ্ছে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসন আইনমাফিক ব্যবস্থা নিতে পারে। জয়দীপবাবু বলেন, নাড়া পোড়ানোর ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কৃষি দপ্তর আইন মাফিক কড়া ব্যবস্থা না নিলে আগামিদিনে দিল্লির পরিণতি এই বাংলাতেও যে ঘটবে তা নিশ্চিৎ ভাবেই বলা যায়।’

রাজ্যের কৃষি উপদেষ্টা প্রদীপ মজুমদার জানান, “জমিতে নাড়া পোড়ালে প্রচুর পরিমাণে উদ্ভিদ খাদ্য নষ্ট হয়ে যায়। আমন চাষ মরশুমে খড়ের অবশিষ্ট অংশ জমিতে পুড়িয়ে না দিয়ে জমিতে গর্ত করে সেখানে তা ফেলেদিয়ে মাটি চাপা দিলে মাটির জৈব কার্বন বৃদ্ধি পাবে। কৃষি জমির উপরিভাগের ৬ ইঞ্চি মাটি সবথেকে মূল্যবান। জমিতে নাড়া পোড়ালে মাটির গঠন ও গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জমিতে নাড়া পোড়ালে উপকারি জীবাণু উত্তাপের কারণে ধ্বংস হয়ে যায়। নষ্ট হয়ে যায় জমির গুনগত মান। এমনকি জমি বন্ধা হয়ে যায়। ধানের নাড়া পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে প্রচুর দূষিত গ্যাস নির্গত হয়। যা মনুষের স্বাস্থের পক্ষেও ক্ষতিকর। জমিতে নাড়া পোড়ানোর সময় আগুনের ফুলকি উড়ে পাশের জমিতে থাকা চাষির পাকা ধানও পুড়ে ভস্মিভূত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা পুরোমাত্রায় থাকে। প্রদীপ মজুমদার আরও জানান, হারভেস্টার মেশিনে ধান ঝাড়ার পর খড়ের অবশিষ্ট অংশ কমপোস্ট বা ডার্বি কমপোস্ট সার তৈরির কাজে লাগালে চাষিরা যেমন উপকৃত হবেন তেমনই দূষণ থেকেও রাজ্যবাসি রক্ষা পাবেন।”