হিলি মরে যাচ্ছে, নেতারা ঘুমোচ্ছেন

99

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, হিলি : রেললাইন দুটি যেন চলে গিয়েছে দিগন্তের দিকে। এপারে ভারত, ওপারে বাংলাদেশ। স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই রেললাইন দিয়ে একদা দার্জিলিং মেল সাত ঘণ্টায় কলকাতা পৌঁছোত। হিলি স্টেশনে মাঝরাতে ওঠা-নামা করার অভিজ্ঞতা বলছিলেন হিলির প্রবীণ অধ্যাপক হিমাংশু সরকার। অথচ কী অদ্ভুত, হিলি রেলস্টেশনটা ভারতের দিকে রইলেও বাস্তবে ওটা বাংলাদেশের। ভারতীয়দের ওখানে পা রাখার অধিকার নেই।

সাদা কিছু ত্রিকোণাকৃতি স্তম্ভ না থাকলে বোঝা কঠিন, রেললাইনের আগের জমিটাই সীমান্ত। দুপারে বাড়িঘর সব একরকম। গাছপালাও। দক্ষিণপাড়া নামে গ্রামে হয়তো একটা গাছ লাগানো হয়েছে এদেশে, তার ডালপালা কিন্তু ওপারে। ইংরেজি ইউ বা ভির মতো দেখতে হিলি সীমান্ত সত্যিই অন্যরকম। সম্ভবত সব ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ভোটের সময়ে বড় নেতাদের কাছে এ শহর অচ্ছুত। একটা দিক শুধু ভারতের। বাকি তিনদিক বাংলাদেশের। ওদিকেও নাম হিলি।

- Advertisement -

তা হিলির অন্তত ১৪টি ভারতীয় গ্রাম ঢুকে রয়েছে বাংলাদেশের হিলিতে। কী অবর্ণনীয় কষ্ট এখনও। ঘুসুরিয়া ও হরিপুকুর গ্রামের কাছে গিয়ে দেখলাম, ওখানে যাওয়ার অধিকার নেই আমাদের। বিশেষ অনুমতি দরকার। কাঁটাতারের মাঝে এক ফালি ঢোকার গেট। সেটা দিয়ে ঢুকতে হয়। সরু রাস্তা চলে গিয়েছে গ্রামের ভিতরে। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে গাড়ি চলছে।

কিন্তু ভারতীয় বাসিন্দাদেরই নিজের গ্রামে ঢুকতে নানা সমস্যা। ১৫ কেজির বেশি চাল আনা যাবে না রে। বাজারে কী আনা হল, দেখাতে হবে রে। একটা গ্রামে শুনলাম, একজনের রান্নাঘর ভারতে, শোওয়ার ঘর বাংলাদেশে। ওঁরা কিন্তু বাংলাদেশের ভিতর স্বচ্ছন্দে চলে যেতে পারেন। ভোট? এঁরা কাঁটাতার পেরিয়ে এপারে এসে অনেক দূর হেঁটে ভোট দিতে আসবেন একটা স্কুলে।

বালুরঘাট থেকে এলে যমুনা নদীর ছোট ব্রিজটা পেরোলেই হিলি শহর। তিনটে রাস্তা তিনদিকে গিয়েছে। কয়েকশো মিটার হাঁটলে সবদিকে বাংলাদেশ। রাইফেল কাঁধে সাইকেল নিয়ে বিএসএফের ছেলেমেয়েরা অসম্ভব কঠিন মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাঝে মাঝে। ব্রিজের মুখে গণনাট্য সংঘ ও ছাত্র ফেডারেশনের দশজন তরুণ-তরুণী পথনাটক করছিলেন প্রখর রোদে। পাশ দিয়ে অটোয় প্রচার চলছিল বিজেপি, তৃণমূলের। দেখতে সব খুব স্বাভাবিক। তবে হিলি মোটেই স্বাভাবিক নয়। পুরোপুরি অস্বাভাবিক।

এ শহর আসলে আস্তে আস্তে মৃত হতে চলেছে ভুটান সীমান্তের জয়গাঁর মতো। জয়গাঁয় ভুটান গেট বন্ধ বলে ব্যবসা চৌপাট। কোভিড পরিস্থিতির উন্নতি হলে তবু সেটা খুলবে। হিলিতে বাংলাদেশ সীমান্ত সরকারিভাবে বন্ধ হওয়ায় পুনর্জন্মের সম্ভাবনা প্রায় নেই।

ধারে-কাছে যত দোকানদারের সঙ্গে কথা হল, সবাই প্রকাশ্যে আক্ষেপ করছিলেন পরিস্থিতির অবনতি দেখে। যেখানে বামেদের পথনাটক চলছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে এক তরুণ দোকানদার দেখাচ্ছিলেন, কোন কোন দোকান বন্ধ ক্রেতার অভাবে। বললেন, ভোর সাড়ে পাঁচটায় এখানে আসবেন। দেখবেন, প্রথম বাসের জন্য কত লোক অপেক্ষা করছেন। সবাই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বালুরঘাট। ওখান থেকে ট্রেন ধরে  কলকাতা বা অন্য কোথাও। এখানে কোনও কাজ নেই।

এক প্রবীণের স্মৃতিচারণ, আগের হিলিতে এলে দেখতেন, এই জায়গাতেই ছোট ছোট থলি নিয়ে বাংলাদেশিরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জিরে, কাপড়, স্টেশনারি জিনিস কিনে নিয়ে যেতেন। এঁরা কখনও যমুনা ব্রিজের ওপারে যেতেন না। কেনাকাটা করে চলে যেতেন। এক তরুণের হতাশা, চার-পাঁচ বছর আগেও আমাদের দোকানে দিনে এক লাখ টাকার জিনিস বিক্রি হত। এখন পাঁচ হাজারও হয় না। বাংলাদেশিরা প্রচুর কিনে নিয়ে যেত।

তাঁদের আক্ষেপ বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে ইউটিউবে হিলি বর্ডার বাজারের ভিডিও দেখলে। বাংলাদেশেও জায়গাটার নাম হিলি। সেখানে অসংখ্য দোকানে মিলছে ভারতের অসংখ্য জিনিস। বাংলাদেশিরা কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বহুদূর থেকে এসে। আর এদিকে এ বাংলার হিলি শুকিয়ে যাচ্ছে।

সত্যিই হিলিতে কাজ নেই। এবং অনেক কিছুই নেই। ঘুরে দেখা গেল, বিখ্যাত চালের মিলগুলো বন্ধ হয়ে রয়েছে। বালুরঘাট থেকে বুনিয়াদপুর আসার পথে যেমন এক ছবি। হিলিতে একটা সময় বিড়িশিল্প খুব জনপ্রিয় ছিল। সব শেষের পথে। ভোটের হাওয়ায় এখানে মানুষের মনে সুখ নেই।

হিলিতে তা হলে আছেটা কী? আছে দুটো মারাত্মক জিনিস, যা আরও শেষ করে দিচ্ছে পরিবেশকে। সর্বনাশা ড্রাগের নেশা এবং ব্যাপক চোরাকারবার। পুলিশ এবং রাজনীতির মাথাদের যোগসাজশে যা ফুলেফুঁপে উঠেছে। অজস্র ঘরে নেশা করছেন তরুণরা। সেটা শুধু হিলি নয়, কাছের বড় শহর ত্রিমোহিনীতেও। সীমান্ত সেখান থেকেও খুব কাছে। ওদিকে কাঁটাতার নেই। ওখান দিয়ে সব নেশার জিনিস পাচার হয়।

ত্রিমোহিনীর ত্রিকোণ মোড় থেকে সামান্য দূরে, চকদাপটে বিশাল মাঠের মধ্যে বহু বছরের পুরোনো তেঁতুল গাছের নীচে বিকটকালী মন্দির। পাল যুগের যোগসূত্র খোঁজা চলে সেখানে। এ মাঠেই ভারতীয় বাহিনীর ক্যাম্প হয়েছিল বাংলাদেশ যুদ্ধের সময়। এখান থেকে কিছু দূরে সীমান্ত। হিলির মতো কড়াকড়ি না থাকায় ওই জায়গাটা নেশাড়ু চোরাকারবারিদের নজরে।

কতটা নেশায় জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের স্মরণীয় হিলি? স্তম্ভিত হয়ে দেখি, স্টেশন সংলগ্ন লেভেল ক্রসিংয়ের কাছে এক বাংলাদেশি মহিলা নেশার ঘোরে পাগলের মতো করছেন। রেললাইনে তাঁকে সামলাচ্ছে ও দেশের মহিলা পুলিশ। লেভেল ক্রসিং দিয়ে দুটো দেশের ট্রাকের যাতায়াত। আর এই যাতায়াতে লুকিয়ে প্রচুর বেআইনি কাজকর্ম। ভবিষ্যতে এখান দিয়ে তুরা করিডরের গাড়িগুলো ভারতে আবার ঢুকবে। তখন চোরাকারবারিদের পোয়াবারো। এ অঞ্চলে চোরাকারবারিরা বাড়িতে বসে ফোনে ব্যবসা সারে। সচরাচর বাইরে বেরোয় না।

কোচবিহারের বাংলাদেশ সীমান্ত চ্যাংরাবান্ধায় দেখেছিলাম, বাড়িতে বাড়িতে ট্রাক। পাথরকুচির ব্যবসা করে মানুষ লালে লাল। হিলিতেও একই দৃশ্যমালা। শহরে ঢোকার মুখে স্কুলের মাঠের পাশে শহিদবেদি। বাংলাদেশ যুদ্ধে এখানেই অনেক ভারতীয় সেনা মারা যান পাক সেনাদের আচমকা হামলায়। সে মাঠে সার দিয়ে খালি ট্রাক দাঁড়িয়ে সব স্থানীয়দের ট্রাক।

চ্যাংরাবান্ধায় সব পাথরকুচি আসে আশপাশের নদী থেকে, বেআইনিভাবে। হিলিতে পাথরকুচির সব ট্রাক আসে ঝাড়খণ্ডের পাকুড় থেকে। ওপার থেকে বেশি আসে চিটেগুড়। জাতীয় সড়কে ট্রাকের পর ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকে। সোজা রাস্তায় বাংলাদেশে বাণিজ্য করতে গেলে রাস্তায় মাসখানেক পড়েই থাকবে আপনার ট্রাক। দাদা ধরলে নো চিন্তা। নিয়ম ভেঙে বেশি ভারী ওজনের মালপত্র নিয়ে ট্রাক চলে যাবে ওপারে। বিনিময়ে দাদাদের পকেটে ঘুরপথে সোনা চলে আসে। হিলির পথ ভরে থাকে অসততায়। ভারী ভারী ট্রাকে বেহাল জাতীয় সড়ক।

এলাকায় হিন্দুদের সংখ্যা অনেক বেশি। সেটাকে অস্ত্র করে বিজেপির রমরমা মারাত্মক। কাঁটাতার নিয়ে স্থানীয়দের দুরকম মত। একদল বলছে, কাঁটাতার সব জায়গায় লাগানো হচ্ছে না কেন? এ প্রশ্নেও বিজেপি-তৃণমূলের নেতাদের কাজিয়া গনগনে। অন্য দলের বক্তব্য, কাঁটাতার লাগিয়ে যখন কিছু হচ্ছে না, তখন রেখে লাভ কী? বাংলাদেশিরা এলে তবু ব্যবসা বাঁচবে।

হিলি যেদিন যাই, সেদিন বালুরঘাটে নামী নেতার সভা। হিলির দিক থেকে পরপর বাস আসছিল। বাসের মাথায় সমর্থকদের ভিড়। স্থানীয় অনেক তরুণ এঁদের চেনেন পাচারকারীদের সঙ্গী হিসেবে। কাদের পতাকা নিয়ে শেষপর্যন্ত কাকে ভোট দেবেন, কেউ জানেন না। যখন-তখন উলটে যেতে ওস্তাদ।

বলছিলাম না, হিলি সীমান্ত একেবারে অন্য রকম!