আলিপুরদুয়ার : কোথাও চড়াই,কোথাও উতরাই,মাঝে মাঝে ধসের জন্য পথটা রীতিমতো বিপজ্জনক। তবু ওই পথে নামতে হবে। হাতে সময়ও খুব বেশি নেই। কাঁধের ওপর বাঁশের মাচায় শুয়ে কাতরাচ্ছে মেয়েটা। খুব তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যেতে না পারলে পরিণতি কী হবে তা বুঝতে পারছেন অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীরা। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করেননি তাঁরা। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন গ্রামবাসীরা। চার ঘণ্টা উৎরাইয়ের পথে নেমে তাঁরা বছর ৩০-এর ডেমকান ডুকপাকে পৌঁছে দিলেন লতাবাড়ি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। গত বৃহস্পতিবার সেখানেই ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিয়েছে ডেমকান।

শুক্রবার সোস্যাল মিডিয়ায়  আলিপুরদুয়ার জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের ডেপুটি সিএমওএইচ–২ সুবর্ণ গোস্বামী ঘটনাটি পোস্ট করেন। তারপরই সেটি ভাইরাল হয়ে যায়।

রাজ্যের প্রত্যন্ত  দুর্গম বক্সা পাহাড়ে বিভিন্ন জনজাতির হাজারখানেক মানুষ বসবাস করেন। এখানে ঐতিহাসিক বক্সা ফোর্টে বহু পর্যটক আসেন। বক্সা ফোর্ট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উপরে লেপচাখা। এখানে প্রায় শ’দেড়েক ডুকপা জনজাতির মানুষের বসবাস করেন। লেপচাখার পর চুনাভাটি হয়ে  আদমা গ্রাম। এই আদমা গ্রাম থেকে খাড়াই পথ পার করলেই কালচিনি ব্লকের রায়মাটাং। তবে বিপদসঙ্কুল ওই পথ দিয়ে বিশেষ কেউ যাতায়াত করেন না।

আদমা গ্রামেই বসবাস ছিলা ডুকপার। গত মঙ্গলবার তাঁর স্ত্রী দেমকান ডুকপার প্রসব বেদনা উঠে। কিন্তু পাহাড়ি পথ পার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে স্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া অসম্ভব ভেবে ছিলা  ভেবেছিলেন বাড়িতেই স্ত্রীকে প্রসব করাবেন। বিষয়টি স্বাস্থ্য কর্মীদের জানা থাকায় তাঁরাই প্রসব বেদনা ওঠামাত্র দেমকানকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেন। বাঁশের মাচায় কাপড় জড়িয়ে স্ট্রেচার তৈরি করে তাঁকে নিয়ে পাহাড় থেকে নামতে শুরু করেন স্বাস্থ্যকর্মী ও গ্রামের কয়েকজন। প্রায় চার ঘন্টা পাহাড়ি পথ  পেরিয়ে পৌঁছে যান উত্তর লতাবাড়ি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। ওই হাসপাতালেই গত কাল এক ফুটফুটে শিশুর জন্ম দেন দেমকান ডুকপা।মা ও শিশু দুজনেই এখন ভালো আছেন বলে স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন।

আলিপুরদুয়ার জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বক্সা পাহাড়ে স্বাস্থ্য পরিসেবা পৌঁছে দিতে ফ্যামিলি প্ল্যানিং নামে একটি সংস্থা জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে কাজ করছে। ওই সংস্থার স্বাস্থ্য কর্মীরাই  ডেমকানকে পাহাড়ি রাস্তায় ট্রেক করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের জেনারেল ম্যানেজার তুষার চক্রবর্তী বলেন, ‘গোটা বক্সা পাহাড়েই জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের সঙ্গে মিলে আমরা স্বাস্থ্য পরিসেবা দিয়ে থাকি। পাহাড়ে আমরা সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পরিসেবা দেওয়র পাশাপাশি প্রসূতিদেরও চিকিৎসা দিয়ে থাকি।তাই দেমকানের বিষয়েও আমাদের জানা ছিল। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছি।’

আলিপুরদুয়ার জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের ডেপুটি সিএমওএইচ–২ সুবর্ন গোস্বামী বলেন, ‘দেমকান ডুকপার ঘটনা একটি উদাহরণ। যে পথ পার করে স্বাস্থ্যকর্মীরা সঠিক সময়ে তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছেন তা একটি নজির। তাঁদের দেখে গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্য কর্মীরা উৎসাহিত হবে। প্রচুর মানুষ স্বাস্থ্যকর্মীদের এই কাজকে কূর্নিশ জানিয়েছেন।’

ছবি- বক্সার পাহাড়ি পথে কাঁধে করে প্রসূতিকে নিয়ে আসছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।।

তথ্য ও ছবি- ভাস্কর শর্মা।।