পাচারের ভরসায় সীমান্তে চলে গাঁজা চাষ

120

মনোজ বর্মন, শীতলকুচি : মানসাই নদীর চর ধরে সবুজ খেত। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, ফসলে ভরে উঠবে গ্রামবাংলা। কাছে গেলেই অবশ্য ধাক্কা খেতে হয়। ফসল নয়, বিঘার পর বিঘা জমিজুড়ে চাষ হয়েছে গাঁজার। এখানেই শেষ নয়, এই গাঁজার চাষ হয়েছে শুধুমাত্র বাংলাদেশে পাচারের ভরসায়। অবৈধভাবে চাষ করা গাঁজা রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পেরিয়ে চোরাপথে চলে যাবে ওপারে। কোটি কোটি টাকার কারবারে বিনিয়োগ করেন শিলিগুড়ি, কলকাতা, এমনকি দিল্লির বিত্তশালীরা। তাদের প্রভাবে গাঁজার খেতে কখনো-সখনো পুলিশ ও আবগারি দপ্তর অভিযান চালালেও কারবার পুরোপুরি বন্ধ হয় না। আর আগাম দাদন পেয়ে নিশ্চিন্তে দুপয়সা আয়ে আশায় অবৈধ কারবারে জড়িয়ে পড়েন প্রান্তিক চাষিরা। কোচবিহার পুলিশ সুপার সুমিত কুমার অবশ্য দাবি করেছেন, এবছর গাঁজা গাছ ধ্বংস করতে পুলিশ লাগাতার অভিযান চালাচ্ছে।

কোচবিহারজুড়েই অবৈধ গাঁজা চাষের রমরমা। কেউ কেউ আবার পোস্ত চাষও করেন। শীতলকুচি ব্লকের মাঘপালা, ভোগডাবরি,  ছোট শালবাড়ি, রাধের চর, কুর্শামারি ছাড়াও মাথাভাঙ্গা-১ ও ২ ব্লকের বালাসি, হাজরাহাট, খেতি ফুলবাড়ি, ভেরভেরি মানাবাড়ি, পারডুবি, মাটিয়ারকুঠি গাঁজা চাষের আঁতুড়। কোচবিহার-১ ব্লকের চান্দামারি, ছোট শালবাড়ি চর এলাকাতেও গাঁজার চাষ চলে অবাধে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ২০ কিলোমিটারের মধ্যেই এসব গ্রাম এখন মাদক মাফিয়াদের টার্গেট। স্থানীয়ভাবে চাষ হওয়ায় সহজেই পুলিশ ও প্রশাসনের নজর এড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে গাঁজা পৌঁছে যায়। সেখানে চোরাকারবারিরা রাতের অন্ধকারে গাঁজার প্যাকেট কাঁটাতারের উপর দিয়ে ছুড়ে দিলেই কেল্লা ফতে। নির্দিষ্ট নম্বর লেখা প্যাকেট ওপারের এজেন্ট ঠিক সংগ্রহ করে নেয়। হাওয়ালার মাধ্যমে টাকা পৌঁছে যায় কারবারের পান্ডাদের কাছে। স্থানীয় এজেন্টদের কাছ থেকে কমিশন পেয়ে যায় ক্যারিয়াররা।

- Advertisement -

শুধু গাঁজা নয়, ভারতীয় কাফ সিরাপের বাংলাদেশে নেশা করার জন্য চাহিদা রয়েছে। মাঘপালার এক গাঁজাচাষি জানান, অবৈধ জেনেও লাভের আশায় অনেকেই গাঁজা চাষে ঝুঁকছেন। নদীর চর সংলগ্ন অনাবাদি কৃষিজমি ও খাসজমিতেই মূলত গাঁজার চাষ করা হয়। প্রত্যন্ত এলাকার দুঃস্থ পরিবারগুলি ঝুঁকি নিয়ে গাঁজা চাষ করে। কারণ আর্থিক দিক থেকে গাঁজার মতো লাভ কোনও ফসলেই হয় না। পুলিশের অভিযানের পরেও কোনওভাবে ১০০ গাছ বড় করে ঘরে তুলতে পারলে বছরের সংসার খরচের টাকা উঠে যায়।

চাষে উত্সাহ দেওয়ার লোকেরও অভাব নেই। স্থানীয় এজেন্টরা তো আছেই, রাজ্যের বাইরে থেকেও এজেন্টরা এসে গাঁজা চাষের বীজ সরবরাহ করে থাকে। চাষের খরচ বাবদ চাষিদের টাকার জোগানও দেয় তারাই। গাঁজা খেত থেকে তুলে, শুকিয়ে প্যাকেটে ভরার সময় পাচারচক্রের পান্ডারা এসে ঘাঁটি গেড়ে থাকে গ্রামগুলিতে। তারপর সুয়োগ বুঝে গাঁজা পাচার হয়। পাচারের কাজে গ্রামের কিশোরদেরই বেশি ব্যবহার করা হয়।

গাঁজার কারবারে জড়িত খেতি ফুলবাড়ির এক কৃষক জানান, এখান থেকে  নিয়মিত গাঁজা চালান যায় বাংলাদেশ, ভুটান এবং নেপালেও। প্রতি বছর আবগারি দপ্তর অভিযান চালালেও তাতে কাজের কাজ তেমন একটা হয় না । এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে গাঁজা চাষ হলেও আবগারি দপ্তর তার খোঁজও রাখে না। আবার এমন কিছু এলাকা আছে যেখানে আবগারি দপ্তরের কর্মী-আধিকারিকরা ঢুকতেই পারেন না। পুলিশও প্রত্যন্ত এলাকার এই গ্রামগুলিতে নিয়মিত যেতে পারে না। ভৌগোলিক দূরত্বের সুযোগ নিয়ে চাষ ও কারবার চলে নিশ্চিন্তে।

শীতলকুচি থানার চারটি বুথ রয়েছে মানসাই নদীর ওপারে। ওই এলাকায় শীতলকুচি থানার পুলিশকে ঘুরপথে প্রায় ৫০ কিলোমিটার যেতে হয়। তাই নিয়মিত অভিযান চালাতে পারে না পুলিশ। আবার কোচবিহার কোতোয়ালি থানার অন্তর্গত শীতলকুচির দুটি বুথে যেতে কোতোয়ালি থানার পুলিশকে ৬০ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়।

ভাঐরথানা গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান চন্দন প্রামাণিক বলেন, গ্রাম পঞ্চায়েত ও প্রশাসনের তরফে গাঁজা চাষের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে শীতলকুচি, গোলেনাওহাটি, লালবাজার থেকে কিছু লোক এসে মানসাই নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের মোটা টাকার লোভ দেখিয়ে গাঁজা চাষ করায়। পুলিশ ও আবগারি দপ্তর কঠোরভাবে পদক্ষেপ করলে গাঁজা চাষ বন্ধ করা সম্ভব।

শীতলকুচির বিজেপি বিধায়ক বরেনচন্দ্র বর্মন মনে করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের ছত্রছায়া ও পুলিশ প্রশাসনের গা-ছাড়া মনোভাবের জন্যই গাঁজা চাষের এত বাড়বাড়ন্ত। তাঁর বক্তব্য, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে তো গাঁজার চাষ হয় না। সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে মানসাই নদীর চরে গাঁজা চাষ হয়। চোরাকারবারিদের মদতেই চাষ হচ্ছে। গাঁজা পাচার করতে যুবকদের একাংশ ভুল পথে যাচ্ছে। বিষয়টি রাজ্য সরকারের গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

গ্রামের বাসিন্দারাও মনে করেন, সীমান্তের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে কর্মসংস্থানের সুয়োগ হলেই পাচারের ক্যারিয়ার আর পাওয়া যাবে না। কেউ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাচারে যাবেন না। একইভাবে গ্রামে চাষিরা ফসলের নিশ্চিত দাম পেলে বা ফসলের ক্ষতি হলে বিমার টাকা পেলে গাঁজা চাষের মতো অবৈধ কাজে জড়াবেন না।