লকডাউনের জাঁতাকলে রণে ভঙ্গ দিয়েছে ফ্লু-জ্বর

359

কলকাতা : সবে ভোরের আলো ফুটেছে। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন ফটিকবাবু। প্রাতর্ভ্রমণ তাঁর বহুদিনের অভ্যাস। লকডাউন শুরু হওয়ার পর বেশ কিছুদিন গৃহবন্দি রেখেছিলেন নিজেকে। কিন্তু আজ আবার বেরিয়েছেন গিন্নির তাড়া খেয়ে, জেমস লং সরণিতে এসে বড় করে শ্বাস নিলেন ফটিকবাবু। এমনি সময় রাস্তাঘাট নোংরা থাকে। দূষিত ভারী বাতাসে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। ধোঁয়াশায় দূরের জিনিস ভালোভাবে ঠাহর হয় না। আজ কিন্তু দিব্যি পরিষ্কার। লোকজন, যানবাহনহীন রাস্তার ধারে কত অজানা পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। দূরে একটা পুকুর। এমন দিনে কাপড় কাচা, গাড়ি ধোয়া, চায়ের দোকানের গুলতানি মিলিয়ে গোটা চত্বরটা আস্তাকুঁড় হয়ে থাকত। আজ কেউ কোত্থাও নেই। পুকুরঘাট পরিষ্কার। উঁকি দিলে বক, মাছরাঙা এমনকি মাছগুলিকেও দেখা যাচ্ছে। হাঁটতে বেশ ভালো লাগছিল ফটিকবাবুর। উলটো দিক থেকে কে যেন বললেন, কী! অনেকদিন পর! কেমন অন্যরকম লাগছে না? মুখে মাস্ক, মাথায় টুপি পরে থাকায় প্রথমটা চেনা য়াচ্ছিল না ভবেশবাবুকে। এবার চিনতে পেরে ফটিকবাবু বললেন, হ্যাঁ, যা বলেছেন। সব জিনিসেরই তো ভালোমন্দ আছে, তাই না! শরীরটা বেশ তরতাজা লাগছে।

লকডাউনের জেরে দিন আনা দিন খাওয়া দিনমজুরদের অনেক ক্ষতি হলেও ফটিকবাবু, ভবেশবাবুদের মতো অনেকের অনেক উপকারও হয়েছে। ঋতু পরিবর্তনের কথা শুনলেই যাঁরা গলায় স্কার্ফ জড়াতেন, তাঁদের আর তত ভয় পাওয়ার পরিস্থিতি নেই। কারণ, দোর্দণ্ডপ্রতাপ করোনা ভাইরাসের কাছে আত্মসমর্পণ করে ইতিমধ্যে বেশ কিছু চেনা ভাইরাস রণে ভঙ্গ দিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। ফি বছর এই ঋতু পরিবর্তনের সময় রাইনো অ্যা ডিনো, মেটা-নিউমো, ইনফ্লুয়েঞ্জা ইত্যাদি নন-কোভিড জাতীয় কিছু ভাইরাস সংক্রমণের ঘটনা ঘটত। সর্দি-জ্বর নিয়ে পাড়ার ক্লিনিকে ভিড় করতেন বাচ্চা-বুড়ো অনেকেই। এবার সেই ভাইরাসও নেই, ডাক্তারদের চেম্বারে ভিড়ও নেই। চিকিৎসকদের ধারণা, করোনা সংক্রমণ রুখতে ঢালাও লকডাউন, সামাজিক দূরত্বের বিধিনিষেধ এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ আরও যত্নশীল হওয়ায় অন্যান্য ভাইরাস সংক্রমণের তীব্রতাও হ্রাস পেয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, যানবাহন কমে যাওয়ায় বাতাসে দূষণ কমেছে। ফলে ফুসফুসে সংক্রমণজনিত অসুখ অনেক কমে গিয়েছে।

- Advertisement -

বেলভিউ ক্লিনিকের অভ্যন্তরীণ ওষুধ পরামর্শদাতা রাহুল জৈন বলেন, ছোটখাটো রোগের ক্ষেত্রে তিনি ফোনেই রোগীদের পরামর্শ দেন। ফলে প্রতিদিনই তিনি বহু ফোন পান রোগীদের কাছ থেকে। গত বছর পর্যন্তও তাঁর কাছে এই সময়ে সাধারণ জ্বরজারি, সর্দিকাশি সারাতে দিনে অন্তত হাফ ডজন ফোন আসত। এবার সেই ধরনের ফোন একটাও আসেনি। প্রায় সবাই ফোন করে জানতে চাইছেন, ডাক্তারবাবু করোনা ঠেকাতে কী করব? তাঁর কথায়, এমনি সময়ে প্রাকৃতিক কারণ, দূষণ ও সামাজিক মেলামেশার ফলে আমরা যে সংক্রমণগুলোর শিকার হই, সেগুলি এবারে হচ্ছে না। লকডাউনের ফলে প্রকৃতি অনেকটা পালটেছে আর সামাজিক দূরত্বের জন্য জীবাণু সংক্রমণ ছড়াচ্ছে না।

আরএন টেগোর হাসপাতালের চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাসের বক্তব্য, বেশিরভাগ সংক্রামক রোগই হাওয়ার মাধ্যমে ছড়ায়। ঋতু বদলের সময় তাপমাত্রা ও বাতাসের চাপ ওঠা-নামার ফলে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। এবারের পরিস্থিতিটা আলাদা। সামাজিক মেলামেশা বন্ধ হওয়ায় এবার সব ধরনের সংক্রমণই অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেকটা কমে গিয়েছে। তাছাড়া বিপর্যয়ে মুখে মানুষের সচেতনতা বাড়াটাও এর অন্যতম কারণ বলে তিনি মনে করেন। ফর্টিস হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ রাজা ধরও সংক্রমণ কমার কারণ হিসাবে বাযু দূষণের মাত্রা হ্রাস, মানুষের ঘরবন্দি দশা এবং সামাজিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির উল্লেখ করেছেন।