একা করোনায় রক্ষে নেই, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস দোসর

88

এমনিতে আমরা করোনা অতিমারিতে জর্জরিত। তার ওপর একটা নতুন সমস্যা এসে জুড়েছে। সেও একপ্রকারের রোগ, নাম তার মিউকোরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস। ইতিমধ্যে দেশজুড়ে করোনা সংক্রামিতদের মধ্যে এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। এই রোগটা কী বা করোনা সংক্রামিতদের কেন হচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে জানিয়েছেন এন্ডোক্রিনোলজিস্ট ডাঃ অরুন্ধতী দাশগুপ্ত

মিউকোরমাইকোসিস কী
মিউকোরমাইকোসিস এক ধরনের ফাঙ্গাস ইনফেকশন, যা মিউকোরমাইসিটস নামে একধরনের ছত্রাক থেকে হয়। সাধারণত এই ছত্রাক পাওয়া যায় মাটি, গাছপালা, সার, পচন ধরা ফল ও সবজিতে। এটা এমনিতে বাতাসে ও মাটিতে থাকে। তবে এই জাতীয় সংক্রমণ বিরল এবং তাঁদেরই সংক্রামিত করে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম।

- Advertisement -

কাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম
যাঁদের ডায়াবিটিস রয়েছে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে স্টেরয়েডড নিচ্ছেন, ক্যানসারের রোগী, যাঁদের অঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে, যাঁরা ইমিউনোসাপ্রেজ্যান্ট ড্রাগস নেন এবং যাঁদের এইচআইভি বা এইডস আছে।

এই রোগ করোনা সংক্রামিতদের বেশি হওয়ার কারণ
করোনার চিকিৎসায় অনেক সময় স্টেরয়েড দিতে হচ্ছে। যাঁদের ডায়াবিটিস রয়েছে, স্টেরয়েড দিলে তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে। অন্যদিকে, যাঁদের আগে থেকে ডায়াবিটিস ছিল না, তাঁদের ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ইনডিউসড ডায়াবিটিস বা নিউ অনসেট ডায়াবিটিস হতে পারে। শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে এবং উচ্চ মাত্রার স্টেরয়েড ব্যবহার করলে মিউকোরমাইকোসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, করোনা সংক্রামিতদের অনেক সময়ই অক্সিজেনের প্রয়োজন পড়ছে। যদি অক্সিজেনের নল পরিষ্কার না থাকে বা যদি অক্সিজেনের হিউমিডিফায়ারের জল নিয়মিত বদলানো না হয় বা পরিষ্কার না থাকে তাহলে সেখানে ছত্রাক জন্মাতে পারে এবং সেখান থেকে শরীরে ঢুকতে পারে। যে সব সংক্রামিতকে দীর্ঘদিন আইসিইউতে থাকতে হচ্ছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিভিন্ন কারণে ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যাচ্ছে।

মিউকোরমাইকোসিসের উপসর্গ
সাধারণত এই ফাঙ্গাস নাক-চোখ-সাইনাস-ফুসফুস এবং কখনও মস্তিষ্কে আক্রমণ করে। প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে রয়েছে, চোখে ব্যথা, চোখ ফুলে যাওয়া, চোখ-নাকের পাশ দিয়ে ত্বক লাল হয়ে যাওয়া, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নাক ভারী হওয়া। এছাড়া অসুখটা বাড়ার সঙ্গে চোখের পাতা পড়ে যাওয়া, নাক ও চোখের ওপর কালো হয়ে যাওয়া, নাকের থেকে কালো বা ধূসর রংয়ের স্রাব বেরোনো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া, রক্তবমি, মাড়ি ফুলে যাওয়া, দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি হতে পারে।
যদি মস্তিষ্কে আক্রমণ করে তাহলে মাথাব্যথা, স্মৃতিশক্তিতে প্রভাব অর্থাৎ ভুলে  যাওয়ার সমস্যা বা ক্রেনিয়াল নার্ভ প্যারালাইসিসও হতে পারে।
এই ফাঙ্গাসের সংক্রমণ মারাত্মক হতে পারে। মিউকোরমাইকোসিস থেকে মৃত্যুর আশঙ্কা প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে যদি সময়মতো রোগ নির্ণয় করা যায় এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া হয়, তাহলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা বেড়ে যায়।

মিউকোরমাইকোসিসের চিকিৎসা
এই রোগের ওষুধ আছে, কিন্তু সেটা যথেষ্ট দামি এবং দীর্ঘদিন চালাতে হয়। যদি সংক্রমণ অনেকটা ছড়িয়ে পড়ে তখন সার্জারি করতে হয় এবং অনেক সময় চোখ বা চোয়াল কেটে বাদ দিতে হয়।

রোগ প্রতিরোধের উপায়
১) রোগীকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।
২) করোনামুক্ত হওয়ার পরেও ধুলোবালি রয়েছে, এমন জায়গায় গেলে মাস্ক পরতে হবে। পরতে হবে গা-ঢাকা জামা।
৩) চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী এবং সঠিক পরিমাণে স্টেরয়ডের ব্যবহার করতে হবে।
৪) পারতপক্ষে বাগান, মাটি থেকে দূরে থাকতে হবে।
৫) মাটির কোনও কাজ করতে হলে গ্লাভস পরতে হবে।
৬) স্নান করার সময় স্ক্রাব ব্যবহার করতে হবে।
৭) দীর্ঘসময় নাক বন্ধ থাকলে সেটা লো সাইনাসাইটিস বলে উপেক্ষা করবেন না।
৮) চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক নেবেন না।
৯) করোনা থেকে সেরে ওঠার পর নিয়মিত সুগার টেস্ট করাবেন এবং সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
১০) উপসর্গ দেখলে অবশ্যই সাবধান হতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনা এবং মিউকোরমাইকোসিস যাইহোক না কেন, দুটোর থেকে বাঁচার উপায় সচেতনতা, সতর্কতা, প্রাথমিক স্তরে রোগনির্ণয় এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা।