ভোটের গৌড়ীয় পথেও জাতপাতের ধুলো

65

রূপায়ণ ভট্টাচার্য, গৌড় : এটাই কি গৌড়-রামকেলি যাওয়ার সেই বিখ্যাত রাস্তা? ঘন-সবুজ আমবাগানগুলো উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে মাঝে মাঝে। সেখানে মাটি ফেলে তৈরি হচ্ছে ট্রাক রাখার পার্কিং প্লট। সবুজ পালটে গিয়েছে গেরুয়ায়। ধুলোময় পথ।

গৌড়ের প্রবেশদ্বারে বিখ্যাত চামকাটি মসজিদের ঠিক উলটোদিকের বাড়িটা নিখিল মণ্ডলের। ঠিক ২৫ বছর হল, কালিয়াচক ছেড়ে তিনি এসেছেন এই বেঁকি গ্রামে। জমিজিরেত-পুকুর করে জীবন চালানো নিখিল ঘরের দাওয়ায় দাঁড়িয়ে শোনাচ্ছিলেন, মাসকয়েকক আগেও এখানে রাস্তাজুড়ে এত ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকত যে, আমাদের হাঁটাচলা প্রায় বন্ধ হয়ে যেত। স্কুলে যেতে পারত না ছেলেমেয়েরা। জোর শব্দে ঘরে থাকা যেত না। চারদিকে ধুলো। এখন মাসকয়েক কমেছে জ্যাম। দেখছেন তো, রাস্তায় কত পাথর পড়ে।

- Advertisement -

সত্যিই, রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে সীমাহীন পাথরকুচি। এ যেন গৌড় নয়, কোচবিহারের চ্যাংরাবান্ধা বা দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি। মহদিপুরের বাংলাদেশ সীমান্ত এখান থেকে সামান্য দূরে। পাথরবোঝাই গাড়ি সব এখান দিয়ে যায় পদ্মাপারে। ১৮৭৪ সালে তৈরি গৌড়ের অন্যতম পুরোনো স্মৃতি চামকাটি মসজিদের গা ঘেঁষে কীভাবে এমন দূষণ ছড়ানো হয়, কে জানে! মসজিদের সামনে একটা লরি ব্রেকডাউন হয়ে পড়ে ছিল।

এতদিন স্থানীয়রা বড় বড় দিঘি এবং আমবাগান দেখিয়ে বলতেন, গৌড়ে মানুষের পেট চলে মাছ আর আম বিক্রি করে। এখন সে জায়গাটা নিতে চলেছে পাথরকুচি। সুস্থানি মোড় থেকে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে শয়েশয়ে ট্রাক। গৌড় যাওয়ার পথে অনেক জায়গাতেই জড়ো করা পাকুড়ের পাথরকুচি। কারও জমিতে পাথরকুচি কিছুদিন রাখতে দিলেই কাঁচা পয়সা। আম, মাছের চেয়ে বেশি আয়। ১২ নম্বর জাতীয় সড়কে (কেন এখনও বহু বোর্ডে পুরোনো ৩৪ নম্বর লেখা থাকে, সেটাই প্রশ্ন) মহদিপুরের দিকনির্দেশ লেখা থাকে, গৌড়ের কথা থাকে না। গৌড় কি পর্যটন মানচিত্রে আচমকা গুরুত্বহীন হয়ে গেল?

আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া দেখি সাদা কাগজে নোটিশ ঝুলিয়ে রেখেছে, গৌড়ের সব মিনার ও মসজিদে- প্রবেশ নিষেধ। অধিকাংশ জায়গা ভাঙা। যে কেউ ঢুকে পড়তে পারেন। ঢুকছেনও। শুধু কদম রসুল মসজিদের সামনে দুই তরুণ দোকানদার প্রসেনজিৎ মণ্ডল ও ঈশ্বর মণ্ডলের আক্ষেপ শুনলাম, পর্যটক না আসায় লাটে উঠতে বসেছে তাঁদের ব্যবসা। আয় কমে গিয়েছে পাঁচ গুণ। ইদেও লোকে উৎসব করতে আসবে না কালিয়াচক, সুজাপুর থেকে- আতঙ্ক এ নিয়ে। কথা বলার সময় হঠাৎ খেয়াল করি, গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে দুটি কুকুর। শব্দ না করে শুধু করুণ মুখে আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে পর্যটকরা এসে এদের বিস্কুট দিতেন আগে। এখন দেওয়ার কেউ নেই বলে মুখ শুকনো।

ভোটের আগে গৌড়ের বিভিন্ন গ্রামে রাস্তার ধুলো-পাথর এবং ব্যবসা বন্ধ ছাড়া কোনও অভিযোগ শুনলাম না। যাঁকে প্রশ্ন করা যায়, তাঁর উত্তর শুনলে নচিকেতা চক্রবর্তীর গান মনে পড়বে, এই বেশ ভালো আছি। আলো, জল, রাস্তা মোটামুটি ভালো। এলাকাটা ইংরেজবাজার বিধানসভার মধ্যে পড়ে। তা হলে ভোট কি তৃণমূলকেই দেবেন? প্রশ্ন শুনে মণ্ডলরা সবাই অকপট উঁচু গলায় ঘোষণা করলেন, এবার ভোট বিজেপিকে।

গৌড়ের সেরা প্রতীক ফিরোজ মিনার যে ছিমছাম সবুজ গ্রামে, তার নাম কনকপুর। রামকেলির দিকে আর একটু এগোলে দাখিল দরওয়াজা। তার সামনে রবিবার সকালে দাখিল পুকুরে মাছ ধরা হচ্ছিল। নব্বই বছরের লক্ষ্মীবিলাস রজক দরওয়াজার ভিতরে ঢুকছিলেন। এ এলাকায় শৈশবে বাঘ দেখেছেন, এমন দাবিও করলেন। ভোটের কী হবে? ভদ্রলোক কণ্ঠিতে হাত রেখে নাটকীয়ভাবে মন্তব্য করলেন, যারে আমি আপন ভেবেছিলাম, সেই হল পর। ব্যাপারটা কী? প্রবীণ ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, টিএমসির ওপর বিশ্বাস চলে গিয়েছে। অনেকের মতো আমিও চিটফান্ডে টাকা রেখেছিলাম। অনেক টাকা জলে গেল। সরকার তো কিছু করলি নিকো।

রামকেলির বিখ্যাত মদনমোহন মন্দিরের ঠিক গা ঘেঁষে রামচন্দ্র দাসের বাড়ি। ছয়-সাত পুরুষ বাস এখানে। এখন থেকেই তাঁর চিন্তা, গতবারের মতো এবারও রামকেলি মেলা বন্ধ হয়ে না যায় করোনার জন্য। ভোটের কথা তুলতে তাঁর স্পষ্ট স্বীকারোক্তি, রামকেলির অধিকাংশ মানুষ আগে ছিল সিপিএম। আগের নির্বাচন থেকে সবাই বিজেপি হয়ে গিয়েছে মোদির জন্য। তৃণমূল কি কাজ করেনি বলে এমন বদল আপনাদের? রামচন্দ্রের মন্তব্য, না, তা নয়। কৃষ্ণেন্দুবাবুই এখানে মন্দিরের সামনে চৈতন্যের মূর্তি বসিয়েছেন। তবে  লোকে এবার ভোট দেবে বিজেপিকে। দুহাত ছড়ানো চৈতন্যমূর্তির নীচে লেখা, রামকেলি ধামে চৈতন্যের পা রাখার পাঁচশো বছর উপলক্ষ্যে মূর্তি উন্মোচন পর্যটন দপ্তরের। ৭ বছর আগের ঘটনা আর রামকেলিতে পাত্তা পাচ্ছে না।

দাখিল দরওয়াজা ও ফিরোজ মিনারের মাঝখানে বাদুল্যাবাড়ি গ্রামে চোখে পড়ল, চৈতন্যের আরেক বিশাল মূর্তি। পাশে রূপ-সনাতন। তৈরি হচ্ছে বৈষ্ণব শাস্ত্রচর্চা কেন্দ্র এবং রূপ-সনাতন মন্দির। উদ্বোধক হিসেবে ফলকে মালদার দুই তৃণমূল নেতার নাম। তাতে লাভ হচ্ছে না। এখানেও সব আম খেতে চলেছে বিজেপি। আমগাছের নীচে মাছধরা দেখতে দেখতে কলেজ পড়ুয়া ছাত্ররা তাই বললেন। কেন বিজেপি? স্পষ্ট উত্তরে অবাক হতে হয়, আমাদের গ্রামে হিন্দুরাই থাকে। তাই বিজেপি। আর একটু এগোলে ভাগীরথী নদী (মানচিত্রে ওটা আসলে পাগলা নদী) পাবেন। নদীর ওপারে মুসলিমরা থাকে। ওখানে টিএমসি ভোট পাবে।

এবারের ভোটের সেই চিরন্তনী ছক। কদম রসুল মসজিদের সামনেও এ কথা শুনছিলাম। সেখান থেকে দুপা দূরে চিকা মসজিদ সংলগ্ন আমবাগান। সেখানে এক দীর্ঘ দেবদারু গাছের গুঁড়িতে ছোট্ট আয়না লাগিয়ে দিব্যি সেলুন তৈরি করে ফেলেছেন অপু প্রামাণিক। গাছের গায়ে সাদা কাগজে লেখা, আজ নগদ, কাল ধার। সাইকেল বা বাইকে বাগানে এসে দল বেঁধে চুল-দাড়ি কেটে যাচ্ছেন হিন্দু-মুসলমান। চলছে একসঙ্গে নীরব প্রতীক্ষা। অথচ ভোটে কী আশ্চর্য পথে আলাদা হয়ে যাচ্ছেন দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

ফিরোজ মিনারের সামনের বিশাল দিঘির বাঁধানো ঘাটে তিন বালক বসে। ক্লাস টু, ক্লাস ওয়ানের ছাত্র। তারাই শুধু গৌড়ের ভাগীরথী নদীর এপার-ওপারের এ অঙ্ক এখনও জানে না। গৌড়ের বিভিন্ন গ্রামে এখনও বাড়ি বাড়ি কাঁচা আম বিক্রি করে যাচ্ছেন তরুণ ফয়জল শেখ। রবি-সকালে নিখিল মণ্ডলের বাড়ির সামনে তাঁর সঙ্গে দেখা। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আজও অটুট। শুধু ভোটের মুখে গৌড় ভরেছে জাতপাতের ধুলোয়।

বহু বহু যুগ আগে পর্তুগিজ পর্যটকরা এসে গৌড়ের ঔজ্জ্বল্যের সঙ্গে তুলনা টেনেছিলেন লিসবন শহরের। পৃথিবীতে ঘনত্বের বিচারে এত বেশি লোক খুব কম শহরে থাকতেন তখন। তুলনা হত ফতেপুর সিক্রির জৌলুসের সঙ্গে। সাম্প্রতিক গৌড়ে এত লোক কম যে, তাঁদের ভোট কতটা প্রভাব ফেলবে ইংরেজবাজারের ভোটে, সেটা নিয়ে সন্দেহ থাকল। হিন্দু-মুসলিমকে কেন্দ্র করে ভোট ভাগ হওয়া বাংলার একদা রাজধানীর ইতিহাস-সংস্কৃতির সঙ্গে মেলে না।

গৌড়ের বিখ্যাত কদম রসুল মসজিদ বা চামকাটি মসজিদের স্থাপত্যে অনেকটা রয়েছে হিন্দু সংস্কৃতির ছাপ। অনেক ঐতিহাসিক বলেন সুলতান হুসেন শাহের সাম্প্রদাযিক সম্প্রীতির মনোভাবের কথা। চৈতন্যদেব রামকেলিতে এলে হুসেন শাহ তাঁর মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যেন মহাপ্রভুকে বাধা না দেওয়া হয়। বঙ্গভোটের গৌড় যেন অস্বীকারই করতে চাইছে ইতিহাসের এসব সম্প্রীতির ছবিকে।