করোনার প্রতিরোধে দায়বদ্ধতা নেই কেন্দ্র ও বহু রাজ্য সরকারের

372

অশোক ভট্টাচার্য

ঠিক এক বছর আগে করোনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আমার লেখা অনেকগুলি নিবন্ধের সংকলন একটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে একটি লেখায় দেখাবার চেষ্টা করেছিলাম, যত বেশি উন্নত দেশ, বিশেষ করে যে সমস্ত দেশে নগরায়ণের হার বেশি, সেই সমস্ত দেশের শহর এলাকার বেশি সংখ্যায় মানুষ করোনা রোগে সংক্রামিত হচ্ছে। মৃত্যুর হারও এখানে বেশি। তুলনায় কম উন্নত দেশগুলিতে করোনা সংক্রামিতের সংখ্যা যেমন কম, মৃত্যুর হারও কম।

- Advertisement -

বর্তমানে আমার অনুমান সঠিক ছিল না বলেই মনে হয়। ভারতে যেভাবে করোনা সংক্রামিত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে বা মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে, তাতে ভারত অচিরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ধরে ফেলতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলি অধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত। তাছাড়া এই সমস্ত দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশের থেকে অনেক দুর্বল। আমার বইটি যখন প্রকাশিত হয়েছিল তখন সারা বিশ্বের মোট করোনা সংক্রামিত মানুষের মধ্যে ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির অংশ ছিল ০.৯৯%। অথচ ২০২০ সালের অগাস্টে ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির অংশ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল সারা বিশ্বের ১৩.১৭%। সেই সময়ে করোনা সংক্রামিত মানুষের ২৬.৩৮ শতাংশই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলির অংশ ছিল ৭.৯২ শতাংশ। এই চিত্র থেকে দেখা যাচ্ছে করোনার ব্যাপ্তির কী দ্রুতগতিতে পরিবর্তন হচ্ছে এবং তা দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে ভারত সহ দক্ষিণ এশিয়ার  দেশগুলিতে।

ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশগুলির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর দুর্বলতার ফলে করোনার নেতিবাচক প্রভাব এই সমস্ত দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে পড়েছে, যা সামলানো এই সমস্ত দেশের পক্ষে কঠিন। ভারতে যেভাবে করোনা সংক্রামিত মানুষের সংখ্যা বা মৃত্যু বাড়ছে, তাতে ২০২১ সালের কোভিড হটস্পট ভারত বা দক্ষিণ এশিয়া। ২০২০ সালে করোনার হটস্পট ছিল আমেরিকা বা ইউরোপের দেশগুলি।

উন্নত দেশগুলির ক্ষেত্রে করোনা বা যে কোনও স্বাস্থ্য বিপর্যয়ে মুখোমুখি হওয়া, উন্নয়নশীল বা গরিব দেশগুলির থেকে কিছুটা হলেও তুলনায় সহজ। কারণ উন্নত দেশগুলির স্বাস্থ্য পরিকাঠামো উন্নয়নশীল দেশগুলির থেকে অনেকটা উন্নত। এই সমস্ত দেশের স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় মোট গার্হস্থ্য  উত্পাদনে উন্নয়নশীল দেশগুলি থেকে অনেক বেশি। স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বেশি বলে উন্নত দেশগুলির চিকিত্সা ক্ষেত্রে মাথাপিছু নিজস্ব অর্থব্যয় অনেক কম।

প্রথম ঢেউয়ে পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থা অনেক উন্নত দেশের তুলনায় এতটা ভয়াবহ ছিল না। তাহলে দ্বিতীয় ঢেউয়ে পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হল কেন?
একথা আমাদের সকলেরই জানা, ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম দুর্বলতম ব্যবস্থা। দশকের পর দশক ধরে ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় ব্যয় মোট গার্হস্থ্য উত্পাদন বা জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ। বহুবার দাবি ওঠার পরও তা বৃদ্ধি করে ২ শতাংশও করা হয়নি। অথচ চিনে এক দশক আগেই এই হার ছিল ২.৯ শতাংশ। এমনকি ভুটানে এই হার ২.৪ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ২.৯ শতাংশ, ফ্রান্সে ৮.৭ শতাংশ, ইতালিতে ৬.৫ শতাংশ, ইংল্যান্ডে ৭.৬ শতাংশ। প্রতি ১০০০ জনে শয্যার সংখ্যা ভারতে ০.৫, শ্রীলঙ্কায় ৩.৬, চিনে ৪.২, ফ্রান্সে ৫.৯, ইতালিতে ৩.২।

চিকিত্সার ক্ষেত্রে ভারতে প্রতি একজন দেশবাসীকে গড়ে ৬২.৫ শতাংশ খরচ পকেট থেকেই দিতে হয়। চিনে এই হার অনেক কম, সেখানে ব্যয় করতে হয় ৩৬.২ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়াতে ৩৩.৭ শতাংশ, ফ্রান্সে ৯.৪ শতাংশ, ইংল্যান্ডে ১৬.০ শতাংশ। প্রতি ১০০০ জনে করোনা রোগের নমুনা পরীক্ষা হয়ে থাকে ভারতে ১৪.৪ জনের, চিনে ৬২.৮ জনের, ফ্রান্সে ৪৫.৬ জনের, ইতালিতে ১১৪.৪ জনের, ইংল্যান্ডে ২৩৯.৭ জনের।

ভারত সহ কয়েকটি দেশের সন্তোষজনকভাবে সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় আসা জনসংখ্যার হারে তাকালে দেখব ভারতের সূচক ৪৭, এমনকি ভুটান ও বাংলাদেশের সেই সূচক যথাক্রমে ৫১ ও ৫৪, চিনে ৭০, কিউবা ৭৩, জার্মানি ৮৬, ফ্রান্স ৯১ ইত্যাদি। এই কয়েকটি তথ্যই প্রমাণ করে ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত হালটি কী।

পঞ্চদশ জাতীয় অর্থ কমিশনের কাছে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য চেয়েছিল ৫.৭৪ লক্ষ কোটি টাকা। ৫.১৩ লক্ষ কোটি টাকাই ছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য। পঞ্চদশ অর্থ কমিশন অনুমোদন করেছে কত? মাত্র ১.০৬ লক্ষ কোটি টাকা, যা ৫ বছরের জন্য জিডিপির মাত্র ০.১ শতাংশ।

স্বাস্থ্য পরিকাঠামো আবার সব রাজ্যে এক নয়। ৭০ শতাংশ রাজ্যের অবস্থা খুবই খারাপ। মন্দের ভালো কেরল, দিল্লি, তামিলনাডু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতি ১০০০ জনে অন্তত ১জন চিকিৎসক থাকা প্রয়োজন, ভারতে রয়েছে ০.৮ জন, চিনে ১.৮ জন। ভারতে প্রতি ১ লক্ষ জনে রয়েছে ৭ জন শল্য চিকিৎসক, চিনে ৮০ জন। ভারতে শুধুমাত্র চিকিৎসার ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে শহর ও গ্রামের বহু মানুষের অবস্থান দারিদ্র‌্যসীমার নীচে নেমে আসছে। সম্প্রতি ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে সংস্থার সমীক্ষা থেকে দেখা ৬৩.২২ মিলিয়ন মানুষ বা ১১.৮৮ মিলিয়ন পরিবার নতুন করে দারিদ্র‌্যসীমার নীচে নেমে গিয়েছে কেবলমাত্র চিকিত্সার অতিরিক্ত ব্যয় নিজের পকেট থেকে নির্বাহ করতে গিয়ে এর ফলে ভারতের গ্রামাঞ্চলে ৬.৬ শতাংশ ও শহর এলাকায় ৫ শতাংশ মানুষ নতুন করে দারিদ্র‌্যসীমার নীচে চলে গিয়েছে।

ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার এই চেহারা নিয়ে শুধু করোনার মতো মহামারিই নয়, যে কোনও সংক্রামক রোগ বা মহামারি প্রতিরোধও কঠিন। শুধু তাই নয়, জনসচেতন করা বা রোগ প্রতিরোধের প্রস্তুতির মধ্যেও দেশের কেন্দ্রীয় বা বহু রাজ্য সরকারের নেই কোনও দায়বদ্ধতা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং পরিকল্পনা। এই প্রস্তুতি, পরিকল্পনা বা অগ্রাধিকারের চরম ব্যর্থতার কারণে পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। উন্নত চিকিত্সাব্যবস্থা, আইসিইউ শয্যা, ভেন্টিলেশন ব্যবস্থার চরম অভাবের বিষয় তো ছেড়েই দিচ্ছি, নেই সাধারণ ওষুধ, নেই অক্সিজেন, নেই অসুস্থ মানুষদের চিকিত্সার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা। দুঃখের কথা, মারা যাওয়ার পর মৃতদেহ দাহ বা সত্কার করার ব্যবস্থাও নেই। প্রধানমন্ত্রী ভারতে প্রস্তুত করোনা টিকা ৯০টি দেশে রপ্তানি করে বাইরের কিছু দেশের প্রশংসা অর্জন করে খুশিতে গদগদ হতে পারেন, কিন্তু সারা বিশ্বের টিকাকরণে অন্যতম ব্যর্থ দেশের নাম আজ ভারত। টিকাকরণে ভারতের স্থান সারা বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্নে। অথচ করোনা মহামারির প্রথম পর্যায়ে পর প্রায় এক বছর সময় পেয়েছিল দেশের সরকার বা বিভিন্ন রাজ্যের সরকার। বিন্দুমাত্র প্রস্তুতি গ্রহণ করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। বিভিন্ন রাজ্যকেও তারা প্রস্তুত হওয়ার নির্দেশও দেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বাংলা দখলই বড় হয়ে গেল, করোনা প্রতিরোধ থেকে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি দায়ী কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির প্রস্তুতিহীনতা।

এমনিতেই ভারতে রাষ্ট্রীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার নড়বড়ে চেহারা, তার ওপর প্রস্তুতি, দায়বদ্ধতা, সদিচ্ছার অভাব, এই রোগ প্রতিরোধে চরম ব্যর্থতার পরিণতিতেই দেশের আজকের এই বিপর্যয়কর অবস্থা। সামনের দিনগুলি হয়তো বা অপেক্ষা করছে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্যে।

(লেখক রাজ্যের প্রাক্তন পুরমন্ত্রী এবং শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র)