বিজেপির গলার কাঁটা এখন নাগরিকত্ব আইন

182

পুলকেশ ঘোষ, কলকাতা : লোকসভা নির্বাচনে ম্যাজিক ফল এনে দেওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনই এবার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে।  ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি তাদের আগের আসন ২টি থেকে বাড়িয়ে ১৮টিতে নিয়ে গিয়েছিল। ওই আসনগুলির মধ্যে ১০টি আসনই মতুয়া ভোটার অধ্যুষিত। লোকসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছিলেন ঠাকুরনগরের মাটি থেকে। মতুয়া সহ সব উদ্বাস্তুকে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। বিজেপির এরাজ্যে আশাতীত ভালো ফল করার পিছনে অনেকাংশে দায়ী ছিল মতুয়া ভোট। নাগরিকত্ব বিল নিয়ে দেশজুড়ে হওয়া আন্দোলনকে পাত্তা না দিয়ে সিএএ বিল পাশ হয় সংসদে। কিন্তু আইনটি পাশ হলেও নিয়মবিধি তৈরি না হওয়ায় সেটি কার্যকর করার বিষয়টি এখনও অথই জলে। ইতিমধ্যেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে সিএএ কার্যকর করার ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে চেয়েছে মতুয়া সম্প্রদায়। বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর নিজেই মতুয়া মহাসংঘের নেতা। তাঁর দাবি মেনেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শার ঠাকুরনগরে জনসভা করার কথা। কিন্তু এপর্যন্ত দুবার ঘোষিত সভা বাতিল হয়েছে। সমস্যা জটিল হয়েছে মঙ্গলবার সংসদে সরকার এ বিষয়ে মুখ খোলার পর।

সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক যা জানিয়েছে, তা থেকে পরিষ্কার, বিধানসভা নির্বাচনের আগে কোনওমতেই নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন কার্যকর হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, নিয়মাবলি তৈরি না হওয়ায় আপাতত সিএএ কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না। ভোটের আগে সিএএ কার্যকর করার ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলতে না পারলে বিধানসভা ভোটে মতুয়া সহ বাংলাদেশ থেকে আগত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভোট নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগতে হবে বিজেপিকে। রাজ্যে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫টি আসনে মতুয়া ভোটই নির্ণায়ক। এছাড়া আরও ৩০টি আসনে মতুয়া ভোট পরোক্ষভাবে নির্ণায়ক। আর সেজন্যই বিজেপি বাংলা দখলে মতুয়া ভোটকে পাখির চোখ করেছে। পরপর দুবার অমিত শা সফর বাতিল করায় মতুয়ারা যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। ৩০ জানুয়ারি শেষবারের মতো তাঁর জনসভা বাতিল হয়। ক্ষোভ সামলাতে কৈলাস বিজয়বর্গীয় ও মুকুল রায় ঠাকুরনগরে গিয়ে শান্তনুবাবুর সঙ্গে বৈঠক করেন। অমিত শা নিজে ফোন করে স্পিকার ফোনে জানিয়ে দেন, মঞ্চ যেন খোলা না হয়। ওই মঞ্চেই তিনি বক্তৃতা দেবেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর কর্মসূচি জানিয়ে দেবেন। কিন্তু তারপর লোকসভায় সিএএ এখনই কার্যকর করতে না পারার ব্যাপারে তাঁর মন্তব্য মতুয়াদের হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

- Advertisement -

এদিন শান্তনুবাবু উত্তরবঙ্গ সংবাদকে বলেন, নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষা করছি। আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে আপত্তি হওয়ার কথা নয়, কিন্তু এই আইনের ব্যাপারে সবকিছু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে এখানে এসে খোলসা করে বলতে হবে। এই আইনের সংশোধনীও আনা দরকার। ওপার থেকে আসার সময় অনেকেই কোনও কাগজপত্র সঙ্গে আনতে পারেননি। তাঁরা কি তাহলে নাগরিকত্ব পাবেন না? এ ব্যাপারটি স্পষ্ট করতে হবে। মতুয়ারা এটাই চাইছেন। সিএএ কার্যকর করার সময় পিছিয়ে যাওয়া ও কাগজপত্র সম্পর্কিত আইনের পরিষ্কার ব্যাখ্যা না দেওয়া নিয়ে সরব হয়েছে তৃণমূল। দলের প্রাক্তন সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর বলেন, বিজেপির ভুয়ো প্রতিশ্রুতি ধরা পড়ে গিয়েছে। সেজন্যই অমিত শা আসব বলেও আর আসতে পারছেন না। আমাদের দাবি, ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে বলতে হবে ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা এসেছেন তাঁরা সবাই নাগরিক। কিন্তু তা ওঁরা করছেন না। এদেশের নাগরিকদের নতুন করে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে বলছেন। বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সুরে মমতাবালা বলেন, এ রাজ্যের ভোটে আমরা মতুয়ারা নির্ণায়ক শক্তি। আমাদের ভোটে বিজেপি সরকার গড়েছে। আমাদের যদি নাগরিকত্ব না-ই থাকে তাহলে সরকারটাই অবৈধ। আর অবৈধ সরকার আমাদের নাগরিকত্ব দেবে কীভাবে? এ ব্যাপারে আইনজীবী তথা কংগ্রেস নেতা অরুণাভ ঘোষ আইনের ব্যাখ্যা করে বলেন, সিএএ কখনোই কার্যকর করা সম্ভব হবে না। এটি আইনে টিকবে না। অন্যান্য দেশে যাঁরা অত্যাচারিত হয়ে এদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তাঁরা কীভাবেই বা তা প্রমাণ করবেন? কোনও রাষ্ট্র কি বলবে, আমি অমুক ব্যক্তিকে মেরে দেশ থেকে তাড়িয়েছি। অনভিজ্ঞ রাজনীতিকরা এই আইন তৈরি করেছেন। এখন বিজেপি নেতৃত্বের জবাবের জন্য অপেক্ষা করে আছেন মতুয়া এবং তপশিলি সম্প্রদায়।