নিউজ ব্যুরোঃ লোকসভা ভোটের আগে অরণ্যে বেআইনিভাবে বসবাসকারী বনবাসীদের উচ্ছেদ প্রসঙ্গে ধীরে চলো নীতি নিচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রের আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, পরবর্তী সরকার গঠন না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যাপারে আর এগোতে চাইছে না কেন্দ্র। জুনের শেষ পর্যন্ত তাই উচ্ছেদ অভিযান তো দূরের কথা, এ ব্যাপারে সমীক্ষা পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।

কিছুদিন আগে এক মামলায় বনবাসীদের উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিমকোর্ট। এঁদের অধিকাংশ আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ। আদালতের সেই নির্দেশের প্রেক্ষিতে গত ৬ মার্চ রাজ্য সরকারগুলিকে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে কেন্দ্রের আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক। এর ফলে প্রায় সাড়ে উনিশ লক্ষ আদিবাসীর বাস্তুচ্যূত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রের পরামর্শ মেনে অরণ্যে বসবাসকারী আদিবাসীদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছিল একাধিক রাজ্য সরকার। আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রকের সচিব দীপক খান্দেকার জানান, এব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। জুন পর্যন্ত সমীক্ষার কাজও স্থগিত রাখা হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযাযী, বর্তমানে ভারতে অরণ্যবাসীর সংখ্যা ৪০ লক্ষের বেশি। তাঁদের মধ্যে মাত্র ২১ লক্ষ বৈধভাবে বসবাস করেন।

উত্তরবঙ্গ বনজন শ্রমজীবী মঞ্চের আহ্বায়ক লাল সিং ভুজেল বলেন, সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে দেশজুড়ে বনের বাসিন্দাদের মধ্যে উচ্ছেদের যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে সেজন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উভয়কেই আমরা দায়ী করছি। ২০১৪ সাল থেকে কেন্দ্র সুপ্রিমকোর্টে বনবস্তির বাসিন্দাদের জন্য আইনজীবী পাঠানো বন্ধ করে দেয়। এর ফলে সুপ্রিমকোর্ট বনবস্তির বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে মামলাকারীদের একতরফা বক্তব্য শুনেই রায় দেয়। রাজ্য সরকারও সুপ্রিমকোর্টে হলফনামা দিযে জানিয়েছিল, রাজ্যের ৮৬ হাজার বনবস্তিবাসীর ক্লেম খারিজ করা হয়েছে। এটা ঠিক নয়। কারণ, বনবস্তির বাসিন্দাদের ক্লেম খারিজ করার অধিকার একমাত্র গ্রামসভার আছে।

অখিল ভারতীয় আদিবাসী বিকাশ পরিষদ রাজ্য কার্যনির্বাহী সভাপতি তেজকুমার টোপ্পো বলেন, সুপ্রিমকোর্টের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি কেন্দ্রীয় সরকার ভুল তথ্য দিয়েছে আদালতকে। কেন্দ্রীয় সরকারের মনে রাখা উচিত বনবস্তিবাসীরা বনের আদি বাসিন্দা। ফলে বন থেকে তাঁদের উচ্ছেদ করার অর্থ তাঁদের জীবন-জীবিকার ওপর আঘাত হানা। এক্ষেত্রে কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির অবস্থানও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আমরা মনে করি, গত পাঁচ বছর কেন্দ্রে ক্ষমতায় থেকে বিজেপি বনবস্তিবাসীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের মারাত্মক পদক্ষেপকে আটকাতে পারত।   কিন্তু তারা সেটা করেনি। তেজ বলেন, জুন মাস পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে বলে শুনেছি। তবে নির্বাচন পার হলেই আমরা সংগঠিতভাবে বনবস্তিবাসীদের অধিকার রক্ষায় আন্দোলনে নামব।

রাভা বনবস্তিবাসীদের গোষ্ঠীপতি গনাথ রাভা বলেন, আমরা রাভারা কয়েক পুরুষ ধরে বনে বাস করছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার অনেক আগে ইংরেজ আমলে বনভূমিতে আমাদের বসবাসকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। আমাদের জীবনযাত্রা, খাদ্য, পোশাক, কৃষ্টি, উৎসব সবকিছুর সঙ্গেই জড়িযে রয়েছে বন। ফলে বন থেকে আমাদের বাইরে বের করে দেওয়া মানে জল থেকে মাছদের বাইরে নিয়ে বাঁচতে বলা, যা বাস্তবে সম্ভব নয়। নির্বাচনের পরে আমরা সমাজের পক্ষ থেকে এনিযে বসব এবং আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করব। আমরা মরতে হলে মরব, কিন্তু কোনো অবস্থাতেই বনের এক ইঞ্চি জমি ছাড়ব না।