পরিযায়ী শ্রমিক: অমিত শাহের চিঠি ঘিরে অগ্নিশর্মা তৃণমূল

478

প্রসেনজিত দাশগুপ্ত, নয়াদিল্লি: শ্রমিক তুমি কার? তৃণমূল না বিজেপির? নাকি শ্রমিকদের নিজের বলে কিছু থাকে না? এ মুহুর্তে দেশজুড়ে অগুনতি পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফেরানো নিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে তাতে শ্রমিকদের নিয়ে এইসব প্রশ্নের অবতারণা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে।

কেন্দ্র-রাজ্য উত্তপ্ত সম্পর্কে নতুন করে ঘি ঢেলেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শা। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিঠি দিয়ে অভিযোগ এনে বলেছেন যে, রাজ্য সরকারের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সাহায্য পাওয়া যাচ্ছে না। ভিনরাজ্য থেকে আসা ট্রেনকে তারা রাজ্যে প্রবেশাধিকার দিচ্ছেননা। রাজ্যের শ্রমিক, মজদুরদের সঙ্গে অন্যায় করছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর ফলে সমস্যায় পড়েছেন ঘরে ফিরতে না পারা রাজ্যের শ্রমিকরা। শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পাঠানো বিতর্কিত সেই চিঠির প্রতিবাদে বিক্ষোভে নেমে এল তৃণমূল কংগ্রেস। চিঠির সূত্রে প্রথমেই সুর চড়িয়েছেন ডায়মন্ড হারবার সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘মিথ্যা অভিযোগ’ বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শা’কে ক্ষমা চাইতে বলেন তিনি। সে সূত্র ধরে একযোগে অমিত শাহের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানালেন তৃণমূল কংগ্রেসের তিন নেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন, কাকলি ঘোষ দস্তিদার ও রাজ্যমন্ত্রী রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়।

- Advertisement -

শনিবার ভিডিও কনফারেন্সিং’র মাধ্যমে অমিত শাহের বিরুদ্ধে নিশানা দেগে ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দীর্ঘদিন সুখনিদ্রায় ছিলেন। আচমকা উঠে বসেছেন। এবং উঠে বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছেন।” ডেরেক বলেন অমিত শা তার চিঠিতে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এনেছেন তা সবৈব মিথ্যা। এর জন্যে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। ডেরেক বলেন, কেন্দ্রের চিঠি রাজ্যের কাছে পৌঁছানোর আগেই মিডিয়ার কাছে চলে যাচ্ছে। এই ঘটনা লজ্জাজনক। তিনি সস্তা প্রচারের জন্য এসব করছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর ডিএনএ তে রয়েছে হিংসা ও সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ানোর ছক। কিন্তু করোনা প্রতিরোধে জরুরি পদক্ষেপ না নিয়ে এভাবে বিভাজনের রাজনীতি খেলা তাকে মানায় না।

ডেরেক বলেন, করোনার গ্রাসে যখন একটু একটু করে চলে যাচ্ছিল দেশ তখন তিনি (অমিত শা) এবং প্রধানমন্ত্রী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে মেতে ছিলেন। অথচ এখন তিনি নীতির দোহাই দিচ্ছেন। ঔরঙ্গাবাদে ওতগুলি শ্রমিক রেললাইনে কাটা পড়লো তার দায় কে নেবে, এই প্রশ্ন রাখেন ডেরেক। জানান, কর্ণাটকের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী ইয়াদুরাপ্পা কিভাবে বাংলার শ্রমিকদের আটকে দিয়েছেন, তাদের ‘বন্ধুয়া মজদূর’ বলে অভিহিত করেছেন এমনকি আটকে দিয়েছেন ট্রেন। ডেরেক বলেন, রাজ্যের তরফে শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে বহু আগেই ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই, কেরল এবং রাজস্থান থেকে দুটি ট্রেনে ২৫০০ শ্রমিক ফিরে এসেছে রাজ্যে। আগামী ৩-১০ মে’র আরও ৮টি ট্রেনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। আগামী ১০-১১ মে নাগাদ জলন্ধর, চণ্ডীগড়, ভেলোর, বেঙ্গালুরু ও হায়দ্রাবাদ থেকে সেই ৮টি ট্রেনে প্রায় ১০ হাজার মানুষ রাজ্যে ফিরবে।

ডেরেক সরকারীস্তরে নানা চিঠি দেখিয়ে দাবি করেন, রাজ্য এই নিয়ে আগে থেকেই উদ্যোগী। অসহযোহীতা মিথ্যা অভিযোগ এনে রাজ্যবাসীকে ভুল বোঝাতে চাইছেন অমিত শা। ডেরেক কটাক্ষ করে বলেন, “আপনি ফের নিদ্রামগ্ন হন। জেগে থাকলে ভেদাভেদ ছড়ানোর কুপ্রচেষ্টা চালাচ্ছেন অমিত শা।”

তৃণমূল সাংসদ ড. কাকলি ঘোষ দস্তিদার বলেন, এখন যে এত নালিশ করছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অথচ সংসদ যখন জরুরিকালীন মুলতুবি রাখার কথা বলেছিল তৃণমূল, সেদিন কোথায় ছিলেন তিনি? কোথায় ছিলেন যখন মাস্ক পড়ে আসার জন্যই তৃণমূল সাংসদদের কটাক্ষ করা হয়, বলা হয় যে বাচ্চাদের মত ছুটি না চাইবার কথা। আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নিজেকে ‘শ্রমিকদরদী’ প্রতিপন্ন করছেন ও মিথ্যা অভিযোগ জানিয়ে চিঠি লিখছেন, করোনা প্রাদুর্ভাবের প্রথমদিন গুলিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, তার সরকার কি মজদূরদের কোন খবর নিয়েছে?

কাকলি বলেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে ১৮ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি পাঠিয়ে সেই সব রাজ্যে গিয়ে আটকে পড়া শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে বলেছে। এদিকে রাজ্যে আটকে পড়া ভিনরাজ্যের শ্রমিক ও মজদূরদের জন্য খুলে দেয়া হয়েছে ৭১১টি ক্যাম্প, সেখানে থাকছেন ২ লক্ষ মজদূর। রাজ্য সরকার নিজে মজদুরদের ফেরাতে ট্রেন, বাসের জোগার করে দিয়েছে। অথচ কেন্দ্র সরকার-ই শ্রমিকদের ট্রেনভাড়া দিতে অস্বীকার করে। এই ভুমিকা অতি লজ্জাজনক বলে জানান বারাসত সাংসদ। ঔরঙ্গাবাদের ঘটনা প্রসঙ্গে দুঃখপ্রকাশ করে কাকলি বলেন, আগে শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিন অমিত শাহ। দিন খাবার, পানিয় জল। পরে না হয় বিভাজনের রাজনীতি খেলবেন। কাকলি বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীকে অপমান মানে, বাংলাকে অপমান। মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় নেমে মানুষের মাঝে থেকে কাজ করেছেন, আপনি (অমিত) কল্পনাও করতে পারবেন না।” অবিলম্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর এই নিম্নমানের মনোভাব পাল্টানোর কথাও বলেন কাকলি ঘোষ দস্তিদার।

রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ঘৃণ্য রাজনীতির শিকার হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। কি করে এমন মিথ্যা অভিযোগ করতে পারেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী? ভিনরাজ্যে আটকে পড়া বাংলার শ্রমিকদের ফিরিয়ে আনতে যে পদক্ষেপ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়েছেন, অন্য কোন মুখ্যমন্ত্রীরা সেই নজির দেখাতে পারেননি। অবিলম্বে কুৎসা রটনা বন্ধ করে মানুষের হিতে রাজনীতি করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও বঙ্গ বিজেপিকে পরামর্শ দেন তিনি।