ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষের শেষ ঠিকানা তিতাবরের গোরস্থান

181

গুয়াহাটি : সে এমন এক গোরস্থান, যেখানে সাবধান হওয়ার দরকার নেই! কারণ, সেখানে ধর্ম, বর্ণ, ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে সবার জন্য অবারিত দ্বার। সাধারণত মিশ্র জনসমাজে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী যেমন উপাসনার স্থান আলাদা হয়, তেমনই মৃত্যুর পরেও তাদের অন্ত্যেষ্টির জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু কিছু জায়গা এখনও আছে, যেখানে মৃত্যুর পর ধর্ম নির্বিশেষে সব মানুষকে একই জায়গায় দাহ করা, কবর বা সমাধি দেওয়া হয়। একই বাগানে পাশাপাশি গোরস্থান ও শ্মশান। এমনই একটি জায়গা হল অসমের তিতাবর ব্লক। এখানে আজও একইসঙ্গে এক জায়গায় হিন্দু, মুসলিম এবং খ্রিস্টানদের নিজ নিজ রীতি মেনে সৎকার করা হয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের দৃষ্টান্ত হিসাবেই এই ব্যবস্থা বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্বের যেখানে যা ধর্মীয় হিংসা হোক, তা থেকে বরাবর শত যোজন দূরে মিলেমিশে থেকেছেন তিতাবরের মানুষ। কবর দাও বা চিতায় পোড়াও, মরলে সবাই মাটি- এই বিশ্বাস থেকে তিতাবরের হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান ও আদিবাসীরা তাঁদের শেষ ঠিকানা রচনা করেছেন একই জায়গায়। এলাকাবাসীর বক্তব্য, মৃত্যুর পর সব মানুষ এক জায়গাতেই তো যাবে। তাহলে এখানেই বা তারা এক হয়ে থাকবে না কেন? শতাব্দীপ্রাচীন গোরঙা গোরস্থান এভাবেই ভিনধর্মের মানুষের মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

জোড়হাট শহর থেকে ২৫ কিমি দূরের ১২ বিঘা জায়গাজুড়ে এই কবরস্থানটি সেই ১৯২০ সাল থেকে ব্যবহার করছেন স্থানীয় হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টানরা, এমনকি আদিবাসীরাও। স্থানীয় প্রবীণরা জানিয়েছেন, ৫টি গ্রামের ৬ হাজার মানুষ ওই গোরস্থান ব্যবহার করেন বংশপরম্পরায়। কিছুদিন আগে তৈরি একটি নিকাশিনালা ছাড়া কবরস্থানটি গত একশো বছর ধরে একইরকম রয়ে গিয়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। গোরঙা কবরস্থান কমিটির সম্পাদক ইমরান হুসেন বললেন, ছোটবেলা থেকেই এই কবরস্থানকে আমাদের পবিত্র ঐতিহ্য বলে জেনেছি। এই জায়গাটা এলাকার ধর্মীয় সম্প্রীতির স্মারকও বটে। সমস্ত ধর্মবিশ্বাসের মানুষ এখানে এসে তাঁদের নিজস্ব বিশ্বাস ও রীতিনীতি অনুযায়ী মৃতদের শেষকৃত্য সম্পাদন করেন। গত ১০০ বছর ধরে এই রীতি চলে আসছে। এখানে ধর্মীয় হিংসার কোনও ইতিহাস নেই।

- Advertisement -

গোরঙা কবরস্থান ১৯৮২ সালে এবং হিন্দু শ্মশান ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিকভাবে নিবন্ধিকৃত হয়। গত কয়েক দশকে গোরঙা গোরস্থানের লাগোয়া এলাকায় অর্থনীতির পরিবর্তন হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল থেকে শুরু করে খেলার মাঠ, স্টেডিয়াম, কমিউনিটি হল তৈরি হয়েছে উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিন্তু গোরস্থানের নিয়মকানুন রয়ে গিয়েছে একইরকম। ইমরানরা চান, বরাবর এমনই থাকুক তিতাবর।