আয়ুর্বেদ পড়ুয়াদের অস্ত্রোপচারের প্রশিক্ষণে ছাড়পত্র

নিউজ ব্যুরো : অদূর ভবিষ্যতে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরাও অস্ত্রোপচার করতে পারবেন। আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত আইনি জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র। মোদি সরকারের এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে ইন্ডিয়ান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েন (আইএমএ)-এর মতো চিকিৎসক সংগঠন। তাদের মতে, এর ফলে চিকিৎসার মান ও রোগীর নিরাপত্তা দুই বিপন্ন হবে। কেন্দ্র যদিও নিজের অবস্থানে অনড়। স্বাস্থ্যমন্ত্রকের নির্দেশিকা ঘিরে উত্তরবঙ্গের চিকিৎসক মহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচারের সুযোগ দিতে ইতিমধ্যে ২০১৬-এর আয়ুর্বেদ স্নাতকোত্তর শিক্ষা আইন সংশোধন করেছে সরকার। কেন্দ্রীয় আয়ুষমন্ত্রক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্নাতকোত্তরস্তরের আয়ুর্বেদ পড়ুয়াদের কয়েক ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এর মধ্যে থাকছে নাক, কান, গলা, চোখ, মাথা, হাড় ও দাঁতের অস্ত্রোপচার। এছাড়া আয়ুর্বেদ পড়ুয়াদের সাধারণ অস্ত্রোপচারের প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে। শল্য ও শালাক্য শাখায় পাঠরত স্নাতকোত্তরস্তরের পড়ুয়ারা এই প্রশিক্ষণের আওতায় আসবেন। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর তাঁরা স্বাধীনভাবে অস্ত্রোপচার করতে পারবেন। ওই বিবৃতি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা এমএস (আয়ুর্বেদ) শল্যতন্ত্র ও এমএস (আয়ুর্বেদ) শালাক্যতন্ত্র ডিগ্রি পাবেন। তাঁরা অঙ্গচ্ছেদ, অ্যাডভান্স গ্যাস্ট্রো ইনটেসটিনাল, স্কিন গ্রাফটিংয়ের ক্ষেত্রেও অস্ত্রোপচার করতে পারবেন। আধুনিক ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের ইতিহাসে কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্ত গভীর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

- Advertisement -

আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের মাধ্যমে জটিল অস্ত্রোপচার কতটা নিরাপদ তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রথাগত শল্য চিকিৎসকদের অনেকেই। আইএমএর মতে, বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসার নিজস্ব পরিধি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে রোগের গুরুত্ব বিচার করে রোগী চিকিৎসা পদ্ধতি বেছে নেন। সরকারের সিদ্ধান্তে চিকিৎসা ব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। অদক্ষ হাতে অস্ত্রোপচার হলে রোগীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। অদক্ষ (হাইব্রিড) চিকিৎসকদের সংখ্যা বাড়বে। আইএমএর সভাপতি রাজন শর্মা বলেন, এক দেশ এক চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিকল্পনা রূপায়ণের চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু এতে গোটা চিকিৎসা ব্যবস্থা তালগোল পাকিয়ে যাবে। দলে দলে উপযুক্ত প্রশিক্ষণহীন হাইব্রিড চিকিৎসক অস্ত্রোপচার শুরু করবেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিপর্যয় আসতে চলেছে। ভারতীয় শল্য চিকিৎসক সমিতির সভাপতি পি রঘুরামও সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অংশ হচ্ছে অস্ত্রোপচার। একে কোনওভাবে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত হবে না। আয়ুর্বেদের স্নাতকোত্তরস্তরের শিক্ষার্থীদের এমএস ডিগ্রি দেওয়া এবং তাঁদের দিয়ে অস্ত্রোপচার করানো যুক্তিসংগত নয়।

আয়ুর্বেদ চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত আয়ুষমন্ত্রকের অধীন সেন্ট্রাল কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ান মেডিসিন (সিসিআইএম)-এর প্রধান জয়ন্ত দেবপূজারি অবশ্য কেন্দ্রের অবস্থানের সঙ্গে একমত। তাঁর বক্তব্য, চোখ-নাক-গলায় অস্ত্রোপচারের মতো বিষয়কে ২০-২৫ বছর আগে আয়ুর্বেদ শাখার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটা নতুন কিছু নয়। আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের অস্ত্রোপচারের অনুমতি দেওয়ার কথা আগে ভাবা হয়নি। বহু বছর ধরে যা চলে আসছে নতুন বিজ্ঞপ্তিতে তাকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছে মাত্র। যদিও আইএমএর অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন। আইএমএর তরফে সিসিআইএম-কে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, চিকিৎসাক্ষেত্রের ধারাগুলিকে মেশানোর এই চেষ্টা যুক্তিসংগত নয়। চিকিৎসাশাস্ত্রের আধুনিক ধারার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকরা পারস্পরিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দেন। শল্য চিকিৎসাকে আয়ুর্বেদ চিকিৎসার অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলে সিসিআইএমের উচিত, তাদের প্রাচীন বইপত্র ঘেঁটে একটি স্বতন্ত্র শল্যচিকিৎসার শৃঙ্খল তৈরি করা। তা না করে তারা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিকে নিজেদের বলে দাবি করতে চাইছে।

এভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রচলিত ভারসাম্য নষ্ট হবে বলে আশঙ্কা আইএমএর। গত ১৯ নভেম্বর কেন্দ্রীয় সরকার যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে তাতে বলা হয়েছে, আয়ুর্বেদের স্নাতকোত্তর কোর্সে অস্ত্রোপচারকে যুক্ত করা হচ্ছে। একইসঙ্গে নাম বদলে ভারতীয় চিকিৎসা কেন্দ্রীয় পরিষদ (স্নাতকোত্তর আয়ুর্বেদ শিক্ষা) সংশোধন বিনিয়ম, ২০২০ করা হয়েছে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা। আলিপুরদুয়ারের তপসিখাতা আয়ুষ হাসপাতালের ডিএমও দেবব্রত তাঁ বলেন, কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তিকে স্বাগত জানাই। এর ফলে আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা অর্শ, ভগন্দর, ফিসচুলা, অ্যাপেন্ডিক্স, হার্নিয়া সহ বেশ কিছু ছোট অপারেশন করতে পারবেন। তবে, আয়ুর্বেদ চিকিৎসকদের দ্বারা অপারেশন সাধারণ মানুষ কতটা গ্রহণ করে সেটাও দেখার। অপারেশন করার মতো যন্ত্রপাতি সহ যাবতীয় পরিকাঠামোও উন্নতি করতে হবে। তবেই আয়ুর্বেদের গুরুত্ব বাড়বে।

উত্তরবঙ্গ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের প্রধান ডাঃ অমরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, সার্জারি বিষয়টি অত সহজ নয়। যাঁকে-তাঁকে অপারেশন থিযোরে ঢুকিয়ে দিয়ে কাটাকাটি করতে বলা হল আর তিনি তা করে দিলেন, এটা হয় না। একটা অপারেশন করতে হলে অ্যানাটমি, ফিজিওলজি, বায়োকেমেস্ট্রি পড়তে হবে। রোগীর শরীরে কোথায় কোন সমস্যা রয়েছে সেটা বুঝতে হবে। আয়ুর্বেদে কি এসব পড়ানো হয়? নর্থবেঙ্গল ডেন্টাল কলেজের অধ্যক্ষ ডাঃ সত্যব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, আমিও বিষয়টা শুনেছি। কিন্তু আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা দাঁতের অপারেশন, বিশেষ করে রুট ক্যানেল ট্রিটমেন্ট (আরসিটি) কীভাবে করবেন? আয়ুর্বেদে এটা শেখানো হয় না। তবে, শিখিয়ে দিলে নিশ্চয়ই পারবেন।

মেডিকেলের চেস্ট মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডাঃ ইন্দ্রনাথ ঘোষ বলেন, আয়ুর্বেদের পাঠক্রমে পুরোপুরি সার্জারি কি শেখানো হয়? আমি একজন এমডি। আমরাও এমবিবিএস করার সময় স্বল্প সময়ে জন্য অপারেশন থিয়েটারে ট্রেনিং নিয়েছি। কিন্তু তা দিয়ে তো অপারেশন করা সম্ভব নয়। সরকার যদি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের আগামীতে কোনও ব্রিজ কোর্স করায় বা একটা নির্দিষ্ট সময়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে তাহলে কিছু কিছু অপারেশন করতে পারে। কিন্তু তবুও সমস্ত অপারেশন করা সম্ভব নয়। শিলিগুড়ির বিশিষ্ট শল্য চিকিৎসক ডাঃ শৈলজা গুপ্ত বলেন, এটা কীভাবে সম্ভব তা আমার মাথায় ঢুকছে না। আয়ুর্বেদে সেই অর্থে সার্জারির কোনও আলাদা কোর্স রয়েছে বলে আমার জানা নেই।