রামকৃষ্ণ বর্মন, জামালদহ : একজন হারিয়েছেন বাঁ পা। অন্যজনের কনুইয়ে নীচ থেকে ডান হাতটি নেই। কিন্তু এতবড়ো বিপর্যয়ও তাঁদের জীবনী শক্তিকে এতটুকু শুষে নিতে পারেনি। হতাশ হয়ে অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাননি। চাননি করুণার পাত্র হতে। সততাকে পুঁজি করে জীবনযুদ্ধে লড়াই করে আজ দুজনই আলো ছড়াচ্ছেন। সেই আলোর ঝরনাধারায় ফুটে উঠছে দুই অটোচালকের জীবনের জয়গানের কাহিনি।

একজন বছর ত্রিশের চঞ্চল বর্মন। অন্যজন আটাশের কোঠায় রবিউল হোসেন। সুস্থ স্বাভাবিকভাবে জন্মগ্রহণ করলেও এঁদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে পরে। কাকতলীয়ভাবে দুজনেই পৃথক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আজ বিশেষভাবে সক্ষম। চঞ্চল বর্মন এগারো বছর আগে ভয়াবহ এক পথ দুর্ঘটনায় বাঁ পা হারিয়েছেন, সেই দুর্ঘটনার প্রায় চার বছর পরে আরেক দুর্ঘটনায় রবিউলের ডান হাত কনুইয়ে নীচ থেকে কাটা পড়ে যায়। রবিউল বিহারের পূর্ণিয়ায় একটি ইটভাটায় কাজ চলাকালীন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। আর চঞ্চল জামালদহ-মাথাভাঙ্গা সড়কের হাজির দোকান এলাকায় গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। চঞ্চলের বাড়ি কোচবিহার জেলার মাথাভাঙ্গা শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। আর রবিউলের বাড়ি মাথাভাঙ্গারই পশ্চিম খাটেরবাড়ি এলাকায়।

দুর্ঘটনায় শিকার হয়ে দুজনেরই জীবনে নেমে এসেছিল ঘোর অন্ধকার। প্রাণে বেঁচে ফিরলেও অঙ্গহানিতে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলেন। এর মধ্যে চঞ্চলবাবু পারিবারিক দিক থেকে আরও একটি আঘাত পান। দুর্ঘটনার পর বাঁ পা চলে যেতেই তাঁর স্ত্রী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু হাজারো প্রতিবন্ধকতা থাকলেও জীবনযুদ্ধে হার মানেননি চঞ্চল ও রবিউল কেউই। কারও দয়া, করুণার উপর নির্ভর না করে দুজনেই রোজগারে নেমেছেন। দুজনই এখন অটোচালক। রোজ সকালের আলো ফুটতেই অটো নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন চঞ্চল ও রবিউল। মাথাভাঙ্গা-নয়ারহাট রুটে অটো চালাচ্ছেন রবিউল। একই রুটে চালাচ্ছেন চঞ্চলও। এক পা নেই। তাই রোজ তাঁকে স্ক্র‌্যাচে ভর করে বাড়ি থেকে বের হন। যখন তিনি যাত্রী নিয়ে চালকের আসনে বসেন, তখন তাঁর পাশেই যত্ন করে রাখা থাকে স্ক্র‌্যাচটি।

স্ত্রী ছেড়ে চলে গেলেও দুই ছোটো ছেলে ও বিধবা মাকে নিয়ে টানাটানির সংসার চঞ্চলের। আর মা-বাবা, ভাই, স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে রবিউলের সংসার। এঁদের জীবন সংগ্রামকে কুর্নিশ জানাতে এগিয়ে এলেন জামালদহের পঞ্চপাণ্ডব নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। রবিবার প্রতিবন্ধী দিবসের প্রাক্কালে চঞ্চল, রবিউলকে জামালদহে ডেকে সম্মান জানানো হয় সংস্থার তরফে। দুজনকে দুটি মোবাইল সেটও উপহার দেওয়া হয়।

সংস্থার সম্পাদক মৃন্ময় ঘোষ বলেন, নিজেদের প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে ওঁরা যেভাবে প্রতিনিয়ত জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, তা যথেষ্ট প্রশংসনীয়। কিছুদিন আগে চঞ্চলের মোবাইল চুরি য়ায়। কিন্তু তাঁর পক্ষে নতুন মোবাইল কেনার সামর্থ্য ছিল না। এদিন নতুন মোবাইল উপহার পেয়ে দারুণ খুশি চঞ্চল বলেন, ফের নতুন করে বেঁচে থাকার আস্বাদ পেলাম। রবিউল বলেন, সৎ পথে উপার্জন করে বেঁচে থাকার আনন্দই আলাদা।