জমানো টাকা ভেঙে দুঃস্থদের পাশে চন্দন

সানি সরকার, শিলিগুড়ি : বাবার মৃত্যুর পর সংসারে আর্থিক অনটন বড়সড়ো অঘটন ঘটিয়ে দিয়েছিল চন্দন মণ্ডলের জীবনে। বেসরকারি স্কুলে ফি দিতে না পারায় নবম শ্রেণিতে পাশ করার পরেও নতুন ক্লাসের বেঞ্চে বসার অনুমতি পায়নি সে। ভক্তিনগরের বাসিন্দা চন্দন কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া। জীবনের মোড় ঘুরিয়ে ফেলতে মনস্থির করে সে। কাদা-মাটি এবং রংতুলি হাতে ধরে জীবনে চলার পথটাই পালটে ফেলে সে। শিলিগুড়ির কুমোরটুলিতে কাজ শিখে সে এখন প্রতিমাশিল্পী।

লকডাউনের জেরে চন্দনের রোজগার বন্ধ এখন। কিন্তু মাস্টার প্রীতনাথ হাইস্কুলের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী চন্দন খুব ব্যস্ত। প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা বের হচ্ছে দুঃস্থদের মুখে অন্ন তুলে দিতে। সে বলে, দারিদ্র‌্যকে খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছি। তাই একটি মানুষের যাতে একদিনও অভুক্ত না কাটে, সেই চেষ্টা করে চলেছি। এমনভাবে জীবনটা ওলটপালট হয়ে যাবে, তা ভাবতেই পারেনি ভক্তিনগরের চন্দন মণ্ডল। ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বাবা বিশ্বনাথ মণ্ডল মারা যান। পরিবারের একমাত্র রোজগেরে বিশ্বনাথবাবুর মৃত্যুতে চন্দনদের গোটা পরিবার দিশেহারা হয়ে যায়। স্কুলের ফি দিতে না পারায় পাশ করার পরেও নতুন ক্লাসে প্রোমোশন দেওয়া হয়নি তাকে। কার্যত বাধ্য করা হয় স্কুল ছাড়তে। অভিমান থাকলেও স্কুলের নাম জানাতে চায়নি সে। চন্দন বলে, টাকা ছিল না বলে হয়তো ওই স্কুলে আর পড়া হয়নি। কিন্তু ওই স্কুলেই তো জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছি। তাই চাই না স্কুলের বদনাম হোক।

- Advertisement -

কিন্তু এই ধাক্কা চন্দনের চোয়াল শক্ত করে দেয়। জীবনকে অন্য স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সে। সাময়িকভাবে পড়াশোনায় ইতি পড়ে। কুমোরটুলির এক মৃৎশিল্পীর কাছে কাজ নেয়। প্রতিমা তৈরির অ-আ-ক-খ শেখা শুরু হয়। সেই শিক্ষা থেকে এখন সে বাড়িতে প্রতিমা তৈরি করছে। চন্দন জানায়, সংসারে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরেছে। মাস্টার প্রীতনাথ হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে আবার পড়াশোনা শুরু করেছে সে। করোনা-লকডাউনে চন্দনের পরিবার কিছুটা হলেও আবার অভাব টের পাচ্ছে। বেশ কয়েটি বরাত পেলেও বাসন্তীপুজো না হওয়ায় সেই মূর্তি নেয়নি কেউই। তবে আনন্দময়ী কালীমন্দির কমিটি এবং পেশায় আইনজীবী সঞ্জয় মজুমদার মূর্তি না নিলেও তাকে টাকা দিয়েছেন বলে জানায় চন্দন। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝেছে, অভুক্ত থাকার কষ্ট কতটা। তাই নিজেদের পরিবারে অনটন থাকলেও সে রোজগারের জমানো টাকা ভেঙে গত কয়েকদিন ধরে দুঃস্থদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে।

প্রতিদিন ভ্যান নিয়ে সে শহরে ঘুরছে রাস্তায় শুকনো মুখে ঘুরে বেড়ানো লোকের মুখে খাবার তুলে দিতে। চন্দন বলে, মানুষ তো মানুষের জন্যই। অনেকেই দুর্দিনে দুঃস্থদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। সামান্য চেষ্টা আমিও করছি। তবে তা এমন কিছু নয়। নিজেদের সংসারের অবস্থা টলমল থাকলেও ছেলেকে বাধা দিতে চান না শিউলি মণ্ডল। তিনি বলেন, দিনের শেষে ওর মুখে হাসি দেখতে চাই। তাই তৃপ্তির কাজে বাধা দিই না।