ঘরে পেট্রোল বানিয়ে তাক লাগাচ্ছেন নগর বেরুবাড়ির চন্দন

4124

সৌরভ দেব, জলপাইগুড়ি : চন্দন সরকার পেশায় কাঠমিস্ত্রি। পরিবারে অভাব-অনটন লেগেই আছে। ছোটবেলায় আরও অভাবের জেরে ক্লাস এইটেই পড়াশোনায় ইতি। ছেলে রবি ক্লাস সেভেনের পডুয়া। করোনা পরিস্থিতির জেরে আজকাল স্কুল বন্ধ। আগে সময় না পেলেও চন্দনবাবু আজকাল মাঝেমধ্যে ছেলের পড়ার বইগুলি উলটেপালটে দেখেন। এই সুবাদেই একদিন তার বিজ্ঞানের বইটা উলটেপালটে দেখছিলেন। প্লাস্টিক থেকে কীভাবে পেট্রোলিয়াম জাতীয় পদার্থ তৈরি হয় তার উল্লেখ ওই বইতে রয়েছে। ব্যাস, চন্দনবাবুকে আর পায় কে! ছেলের সঙ্গে খানিক আলোচনা সেরে কাঙ্ক্ষিত যন্ত্র তৈরিতে নামেন। বাড়ির উঠোনে রীতিমতো নিজস্ব তেল উৎপাদনকেন্দ্র বানিয়ে ফেলেছেন। তাতে তিনি নাকি পেট্রোল, রান্নার গ্যাস ও অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম জেলি বানাচ্ছেন বলে চন্দনবাবুর দাবি। নিজের তৈরি পেট্রোল ভরে প্রতিবেশীর বাইক খানিকটা চালিয়ে ফেলেছেন। তাতে কোনও সমস্যা হয়নি বলেই চন্দনবাবু জানান। তাঁর আবিষ্কার কতটা কাজে দেবে তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন থাকলেও মধ্যবয়সি একজনের এভাবে বিজ্ঞানচর্চায় মাতার ঘটনায় জলপাইগুড়ি সদর ব্লকের নগর বেরুবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের নয়ারহাট রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। উত্তরবঙ্গ বিজ্ঞানকেন্দ্রের এডুকেশন অফিসার বিশ্বজিত্ কুণ্ডু বলছেন, ছেলের পাঠ্যবই দেখে এভাবে একজনের বিজ্ঞানচর্চায় উত্সাহিত হওয়ায় বিজ্ঞানকর্মী হিসাবে আমি যথেষ্টই আনন্দিত। এই পদ্ধতিতে প্লাস্টিক গলিয়ে অপরিশোধিত তেল তৈরি করা সম্ভব। তবে চন্দনবাবুর আবিষ্কার কতটা কাজের তা খতিয়ে দেখতে হবে। পাশাপাশি, এ কাজে যদি তাঁর সাহায্য লাগে সবকিছু খতিয়ে দেখে প্রযোজনে তারও ব্যবস্থা করা হবে।

তিন মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর বর্তমানে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে চন্দনবাবুর সংসার। অভাবের সংসারের হাল ধরতে স্ত্রী দীপালিদেবী গ্রামেই ঘুরে ঘুরে শাড়ি বিক্রি করেন। সংসারে অভাব থাকলে আনন্দও আছে। এই সূত্রে মনে নিত্যনতুন সৃজনের যাওয়া-আসা। কাঠের আসবাব বানাতে সিদ্ধহস্ত চন্দনবাবু বেশ ভালো মূর্তিও বানান। বলেন, অনেক কিছু করব বলে একটা সময় স্বপ্ন দেখতাম। কিন্তু পরিবারের আর্থিক দুরবস্থায় ক্লাস এইটের পর আর পড়াশোনা হল না। কিন্তু কথায় বলে না, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। সবসময় কিছু করার চিন্তাভাবনা যাঁর মাথায় ঘোরাঘুরি করে সেই চন্দনবাবুকে রাস্তা দেখাল তাঁর ছেলেরই স্কুলের বিজ্ঞান বই। সম্প্রতি গিয়ে দেখা গেল বাড়ির উঠোনের একপাশে দাউদাউ করে জ্বলছে উনুন। তার ওপর আড়াআড়ি করে বসানো টিনের ড্রাম। তার একটি অংশে লোহার পাইপ। সেই পাইপের সঙ্গে যুক্ত নাইলনের পাইপ। বেশ লম্বা নাইলনের পাইপের কিছু জায়গায় যুক্ত প্লাস্টিকের বোতল। সেখানেই জমা হয় চন্দনবাবুর আবিষ্কারের ফসল।

- Advertisement -

পাঠ্যবইয়ে বিবরণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় যে কোনও ধরনের প্লাস্টিক গরম করলে তার থেকে যে তরল পদার্থ তৈরি হবে তা থেকে পেট্রোল, ডিজেল, পেট্রোলিয়াম জেলি মিলবে। একইভাবে প্লাস্টিক পোড়ানোর পর তা থেকে নির্গত গ্যাসকে ফিল্টার করলে তা থেকে এলপিজি গ্যাস মিলবে। চন্দনবাবু বলছেন, চারিদিকে ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিক আমাদের খুবই ক্ষতি করে। ঠান্ডা পানীয় বোতল থেকে শুরু করে ক্যারিব্যাগ, কোনওটাই পরিবেশবান্ধব নয়। এই প্লাস্টিককে একজায়গায় জড়ো করে যদি পোড়ানো হয় সেক্ষেত্রে খারাপ ধোঁয়া স্বাস্থ্যের যথেষ্ট ক্ষতি করতে পারে। তবে এই প্লাস্টিককে আগুনের সাহায্যে গলিয়ে ফেলা হলে তা থেকে পেট্রোল, রান্নার গ্যাস মিলতে পারে। চন্দনবাবুর দাবি, তাঁর উদ্ভাবিত যন্ত্রে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় দুকেজি প্লাস্টিক গলালে তা থেকে ৬০০ মিলি পেট্রোল ও ভালো পরিমাণে রান্নার গ্যাস মেলে। নিজের উত্পাদিত পেট্রোল তিনি বাইকে ব্যবহার করেছেন। তবে রান্নার গ্যাসকে মজুত করার পদ্ধতি তাঁর জানা নেই। তাই তাঁর উৎপাদিত রান্নার গ্যাস বর্তমানে নষ্ট হচ্ছে। নিজের আবিষ্কারকে সবার কাজে লাগাতে এখন প্রশাসনের সাহায্যের দিকে চন্দনবাবু তাকিয়ে রয়েছেন।