দিনহাটার কারিগররা খেজুর গুড় তৈরি বন্ধ করেছেন

108

সঞ্জয় সরকার, দিনহাটা : অগ্রহায়ণের শুরুতেই জেলাজুড়ে শীতের আমেজ। দিনের বেলায় তাপমাত্রার পারদ খুব বেশি না নামলেও, গভীর রাতে কনকনে ঠান্ডা জানান দিচ্ছে শীতের আগমনি বার্তার। যদিও পুরোপুরি শীত আসতে অনেক দেরি। তবুও ভোজনরসিক বাঙালি খেজুরের গুড়ের পায়েস, সন্দেশ, মিষ্টি ইত্যাদির খোঁজ করতে শুরু করেছেন। আর বাঙালির এই চাহিদাকে মাথায় রেখে মিষ্টির দোকানগুলিতে শুরু হয়েছে ব্যস্ততা। কোচবিহার জেলার প্রত্যন্ত দিনহাটা মহকুমায় দেদারে বিকোচ্ছে গুড়ের সন্দেশ, মিষ্টি সহ বিভিন্ন সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য। আর স্বাদ মেটাতে সেসব কিনতে কার্পণ্য করছেন না কেউই। তবে এত আড়ম্বরের মাঝেও একটি বিষয় ভোজনরসিক বাঙালিকে পীড়া দিচ্ছে। বাইরে থেকে আমদানি করা গুড় বাজারে সহজলভ্য হলেও স্থানীয় কারিগরদের তৈরি করা খেজুর গুড়ের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এখানকার মানুষ।

দিনহাটা মহকুমার গ্রামাঞ্চল মূলত দ্বিতীয় খণ্ডভাঙনি, কিশামত দশগ্রাম, টিয়াদহ সহ বিভিন্ন এলাকায় আগে খেজুর গুড় তৈরি হত। প্রতিবছর শীতকালে দেশীয় পদ্ধতিতে খেজুরের রস জাল দিয়ে গুড় তৈরির ছবি চোখে পড়ত। তবে কয়েকবছর ধরে এখানে আর গুড় তৈরি হয় না। ফলে স্থানীয় বাজারেও খেজুর গুড়ের জোগান কম। খেজুর গুড় তৈরির সঙ্গে যুক্ত অনেকে জানালেন, খেজুরের রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির ঝক্কি অনেক। রস সংগ্রহ করার দীর্ঘদিন আগে থেকে গাছ পরিষ্কার করতে হয়। তারপর প্রতিদিন গাছের পরিচর্যা ও কনকনে ঠান্ডায় রস সংগ্রহ করা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর। একটি রসালো গাছ থেকে প্রতিদিন ৫-৮ লিটার রস সংগ্রহ করা সম্ভব। কোনো কারণে রস নষ্ট হয়ে গেলে খাটুনিটাই সার। প্রতিদিন ৩০-৪০টি খেজুরের গাছের রস সংগ্রহ করে তা জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করতে প্রচণ্ড খাটুনি হয়। সমস্ত উপাদান ও জ্বালানি কেনার পর বিশেষ লাভও হয় না। তাই কষ্টসাধ্য এই পেশা ছেড়েছেন অনেকেই। কৃষিকাজ কিংবা দিনমজুরির পেশাকেই অাঁকড়ে ধরছেন তাঁরা।

দিনহাটা-১ ব্লকের হরেন বর্মন বলেন, খেজুরের গুড় তৈরি করে লাভ বিশেষ হয় না। তাই আর গুড় বানাই না। স্থানীয় পাইকারি বাজারে গুড় ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিকোয়। রস তৈরির উপাদান, জ্বালানির দাম আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। আগে পুষিয়ে যেত। তবে এখন লাভ হয় না। তাই প্রায় সকলেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছি। তিনি আরও একটি সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যাও কমেছে। অধিকাংশেরই নিজস্ব গাছ নেই। আগে গাছের মালিকদের সামান্য অর্থ, রস কিংবা খেজুর গুড় দিলেই গাছ থেকে রস সংগ্রহের অনুমতি মিলত। তবে বর্তমানে অনেক গাছের মালিকই গাছ প্রতি প্রচুর টাকা দাবি করেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। তাই অন্য পেশাকেই বেছে নিচ্ছি আমরা।