বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : ’হালত খারাব হ্যায়, ভাগ যাও।’ সেনা জওয়ানদের এই নির্দেশ শুনে প্রাণ হাতে জম্মু থেকে দিন কতক আগে ফিরে এসেছে ১২ জন শিশুশ্রমিক। উত্তর দিনাজপুরে ফিরে এলেও তারা বাবা-মায়ের কাছে যেতে পারেনি। তাদের ঠাই হয়েছে সরকারি হোমগুলিতে। ওদের ফেরার পর ৪ দিন কেটে গেলেও এখনও চোখে-মুখে রয়ে গিয়েছে আতঙ্কের ছাপ। ওদের কথায়, ঘুমের মধ্যেও কানে ভেসে আসছে সেনা জওয়ানদের সেই হুংকার- হালত খারাব হ্যায়, ভাগ যাও।

মঙ্গলবার হোমে বসে এমনই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শোনাল উত্তর দিনাজপুর থেকে জম্মুতে কাজ করতে যাওয়া শিশুশ্রমিকরা। তাদের কথা অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা তুলে নেওয়ার পর প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বাড়ির সঙ্গে। কারণ, তাদের যোগাযোগের সব মাধ্যমেই প্রায় বন্ধ। ফোন, ইনটারনেট চলছে না। কাজ নেই। তাই আর সাত-পাঁচ না ভেবে জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে বাড়তি টাকা খরচ করে জম্মুর পড়শিদের কথা মেনে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেয় ১২ জন শিশুশ্রমিক। তাদের মধ্যে দশজন ছেলে, দুজন মেয়ে। তারা কেউ সাইকেলের ফ্যাক্টরিতে, কেউবা আপেলের বাগানে কাজ করত।

সেনা জওয়ানদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সবাই একত্রিতভাবে জম্মু থেকে পালিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু জম্মু স্টেশনে ধরা পড়ে যায় পুলিশের হাতে। এরপর ওদের ঠিকানা হয় জম্মুর এক আশ্রমে। এরপর খবর আসে পরিবারের কাছে। পরিবারের সদস্যরা দ্বারস্থ হন জেলার পুলিশ-প্রশাসনের কাছে। এরপরেই প্রশাসনের উদ্যোগে সম্প্রতি রায়গঞ্জে ফিরে আসে তারা। তাদের মধ্যে চারজনের বাড়ি হেমতাবাদ থানার বাঙালবাড়ি এলাকায়। বাকিদের বাড়ি রায়গঞ্জ থানার বড়ুয়া গ্রাম পঞ্চায়েত সহ অন্য এলাকায়।

এই নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারম্যান অসীম রায় বলেন, ১০ জন বালক ও দুজন বালিকাকে জম্মু থেকে উদ্ধার করে নিয়ে এসেছে জেলা পুলিশ। আপাতত রায়গঞ্জের দেবীনগরে অবস্থিত সিএনসিপি হোমে দুইজন বালিকাকে রাখা হয়েছে। বাকিদের রাখা হয়েছে কালিয়াগঞ্জ থানার কুনোরের হোমে। হেমতাবাদ থানার বাঙালবাড়ির বাসিন্দা সমর বর্মন বলেন, জম্মুতে একটি সাইকেলের কারখানায় কাজ করতাম। নিজেরাই রান্না করে খেতাম। যে ঘরে থাকতাম সেই ঘরেই রান্না করা হত। সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ। কাজের মজুরি মাথাপিছু ৫৫০ টাকা।

সমর জানাচ্ছেন, মাসের পয়লা তারিখ থেকেই জম্মুতে পরিস্থিতি অন্যরকম হতে শুরু করেছিল। সেদিন থেকেই ট্রাকে করে জম্মুতে ঢুকতে শুরু করে সেনা জওয়ানরা। ৫ তারিখ পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়ে ওঠে। চারিদিকে শুধু আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে সেনা আর সেনা। ফলে দিনমজুরের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ছয় মাস আগে প্রথম যখন জম্মুতে কাজে গিয়েছিলাম, তখন থেকেই রাস্তায় রাস্তায় পাড়ার মোড়ে মোড়ে সেনা জওয়ানদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি। আমরা যে শ্রমিক তার পরিচয় জানান দিতে সব সময় গলায় গামছা নিয়ে রাস্তাঘাটে যাতায়াত করতে হত। আর সঙ্গে থাকত আধার কার্ড।