উজ্জ্বল রায়, ধূপগুড়ি : আলু দেখতে কেমন বা তার রং কী তা ওদের সমবয়সিরা জানে। বইয়ের পাতায় তো বটেই, বাড়ির রান্নাঘরে গিয়ে হয়তো তা হাতে নিয়ে দেখেছে। কিন্তু ওরা অবশ্য একদম আলাদা। আলুর বিষয়ে ওদের অর্জিত জ্ঞান সমবয়সিদের তুলনায় অনেকটাই বেশি। আলু দেখতে কেমন বা তার রং কী তা তো ওরা জানেই, পাশাপাশি সেই আলুর চাষ থেকে কীভাবে তা খেত থেকে কেটে তুলতে হয় সেটাও ওরা দিব্যি শিখে নিয়েছে। বাড়ি বা চায়ের দোকানে শিশুশ্রমিকদের কাজে লাগানো নিয়ে অনেক হইচই হলেও জলপাইগুড়ি জেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে বলতে গেলে সবার অলক্ষেই এই শিশুশ্রমিকদের দিয়ে আলুর খেতে কাজ করানো হচ্ছে। এই বয়সেই টাকার ক্ষমতা জেনে যাওয়ায় ওদের অনেকে স্কুল য়াওয়া ছেড়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ। এনিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। সবকিছু জেনেও প্রশাসন উদাসীন হয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ। অভিযোগ পেলে প্রশাসন অবশ্য ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।

স্কুল শিক্ষক গৌতম রায় বলেন, প্রান্তিক এলাকাগুলিতে আলু চাষের সময় স্কুলছুটের সংখ্যা বাড়ে। আলুখেতে কাজ করার জন্যই অনেকে এই সময়টায় স্কুলে আসে না। ধূপগুড়ির বিডিও শঙ্খদ্বীপ দাস বলেন, শিশুশ্রমিকদের দিয়ে শ্রম করানো আইনত অপরাধ। আলুর খেতে শিশুশ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানো নিয়ে আমরা এখনও কোনো অভিযোগ পাইনি। পেলে অবশ্যই প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি, ময়নাগুড়ি, বীরপাড়া এলাকার বিভিন্ন আলুখেতে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলাদেরও সমানতালে কাজ করতে দেখা যায়। এবারে এই তালিকায় শিশুশ্রমিকরা যুক্ত হয়েছে। পুরুষরা গড়ে দৈনিক ৩০০ টাকা আর মহিলারা ১৫০ টাকা করে মজুরি পান। তবে শিশুদের দিয়ে কাজ করিয়ে মালিকরা তাদের মাত্র ১০০ টাকা মজুরি দেন। লাভ বেশি থাকায় জেলার বিভিন্ন প্রান্তে শিশুদের দিয়ে আলুখেতে কাজ করানোর প্রবণতা বাড়ছে বলে অভিযোগ। এই টাকায় এই শিশুরা মাঠে আলু লাগানো থেকে সেই আলু কাটা তো বটেই, এই চাষ সংক্রান্ত আরও কঠিন কাজ করে থাকে। সম্প্রতি ধূপগুড়ির গাদং ভোটপাট্টি এলাকায় এমনই পাঁচ শিশুশ্রমিককে মাঠে কাজ করতে দেখা গেল। তাদের তিনজন স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলের তৃতীয় শ্রেণি আর বাকি দুজন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। মাঠে কাজের বিষয়ে প্রশ্ন করায় তাদের জবাব, স্কুলে বিশেষ চাপ নেই। তাই স্কুল না গিয়ে তারা মাঠে কাজ করছে।  কারও কারও বাবা-মা আবার খেতমজুরি করেন। বাড়তি রোজগারের আশায় তাঁরা তাঁদের সন্তানদের আলুর খেতে কাজ করতে পাঠিয়েছেন। আলুর খেতে শিশুশ্রমিকদের কাজ করানো নিয়ে বিতর্ক উঠলেও সংশ্লিষ্ট এক খেতমালিকের বক্তব্য, আমরা কাউকে জোর করে এখানে কাজ করাতে আনিনি। ওরা নিজেদের বাবা-মায়ের কথায় আলুখেতে কাজ করতে এসেছে। বিনিময়ে আমরা ওদের মজুরিও দিচ্ছি। তাই কোনোভাবেই আমাদের দোষ দেওয়া যাবে না।

ওই খেতমালিক নিজেদের সপক্ষে যুক্তি দিলেও সংশ্লিষ্ট মহল অবশ্য ঘটনার নিন্দা করেছে। ধূপগুড়ির সমাজকর্মী অলোক রায় বলেন, গরিবির জেরে বন্ধ চা বাগান ও গ্রামাঞ্চলে শিশুশ্রমিকদের সংখ্যা বাড়ছে। এই শিশুদের দিয়ে স্বল্প মজুরিতেই অনেক কাজ করিয়ে নেওয়া যায়। ফলে পূর্ণবয়স্ক শ্রমিকদের সেভাবে প্রয়োজন হয় না। এর জেরে বিভিন্ন জায়গায় শিশুশ্রমিকদের দিয়ে কাজ করানোর প্রবণতা বাড়ছে। সমস্যা মেটাতে প্রশাসনকে বিভিন্ন জায়গায় অতর্কিত হানা চালিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।  গাদং-২  গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান সুশীলচন্দ্র রায়ে বক্তব্য, এই সমস্যা মেটাতে আমাদেরই সামাজিকভাবে সচেতন হতে হবে। নইলে এই সমস্যা কোনো দিনও মেটানো যাবে না।