ছোট বয়সেই গড়েপিটে নিন

326

শিশু ভমিষ্ঠ হওয়া থেকে তাকে নিয়ে আমাদের স্বপ্নের সীমা থাকে না। তাদের কল্পনার রথে চড়িয়ে আমরা অভিভাবকেরা এক পরম তৃপ্তি অনুভব করি। কিন্তু কোনও দিন যদি চোখের সামনে সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হতে দেখি, চরম হতাশায় ভরে ওঠে আমাদের জীবন। তাই নবজাতক থেকে বাল্যকাল, কৈশোর থেকে যৌবন জীবনের প্রথমার্ধের কযেটি মাইলফলক জেনে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জানাচ্ছেন শিশুমঙ্গল চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের ডাঃ নীলাঞ্জন মুখোপাধ্যায়।

আমরা জানি, ছোট বয়সেই মানব মস্তিষ্কের বিকাশ সর্বাধিক হয। সেভাবে অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে, যাতে এই সময শিশুর কাছে কোনও ভুল বার্তা না যায। উৎসাহের আতিশয্যে অনেক বাবা-মা শিশুকে অতিরিক্ত শাসন করে ফেলেন। দিনের প্রতি কাজে আদেশ ও নির্দেশের ভারে জর্জরিত শিশু ক্রমশ হাতের নাগালের বাইরে যেতে থাকে, এর সঙ্গে যুক্ত হয বকুনি ও মার। পরিসংখ্যান বলছে, কর্পোরেট পানিশমেন্ট পাওয়া শিশুদের পরবর্তী জীবনে সাফল্যের হার কম এবং স্বভাবগতভাবেও তারা তাদের প্রতিপক্ষের থেকে পিছিযে থাকে। মুশকিল হল, কীভাবে সন্তান বড় করব, এর জন্য কোনও প্রোটোকল বা গাইডলাইন নেই। নেই কোনও সিলেবাস। কারণ কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট হওয়ার মতো প্রতিটি শিশুরও বেড়ে ওঠা এবং মানসিকতা পৃথক।

- Advertisement -

চার বছরের ছোট্ট কিঞ্জল সদাব্যস্ত, দুরন্ত, সারাদিন কেবলই শাসনের ঘেরাটোপে বেচারার প্রাণ ওষ্ঠাগত। বাবা-মা ছুটল চিকিৎসকের চেম্বারে, বাচ্চা সততই প্রবল জেদ ও রাগী। আসুন না, আমরা একটু অন্যভাবে ভাবি। লক্ষ্য রাখবেন, শিশুর যে কোনও আচরণই পরিস্ফুট হয তার পূর্ববর্তী কোনও ঘটনার থেকে, যা আসে পারিপার্শ্বিক মানুষ বা পরিবেশ থেকে। অর্থাৎ মনে করুন, একটি ঘরে বড়রা সবাই গোল হযে বসে আড্ডা দিচ্ছেন। একটি ছোট মানুষ প্রবলভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় রয়েছে। কারও শিশুর দিকে মনোযোগ নেই। এর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে সে এমন কিছু করতে বাধ্য হয যাতে সবাই তার দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য। আরেকটি কথা জেনে রাখবেন, বকাঝকা করাটাও শিশুর কাছে একটা পাওনা।

অতএব শিশুর এই আচরণ সাধারণের চোখে রাগ বা জেদের প্রকাশ হলেও তা আসলে মনোযোগ পাওয়ার জন্য। এইভাবে ব্যাখ্যা করলে দেখা যাবে, শিশু প্রধানত তিনটি কারণে জেদ করে- ১) কিছু পাওয়ার জন্য ২) কোনও বিশেষ ঘটনা বা কাজ এড়ানোর জন্য এবং ৩) বড়দের  মনোযোগ বা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য।

তাই ব্যাপারটা যদি এভাবে বলা যায, আমাদের কোনও আচরণ বা ভুল বোঝা থেকেই শিশুর জেদের উত্তরণ। তাই জোর করে শিশুর উপর চাপিয়ে দেওয়ার বদলে নিজেদের আচরণ কিছুটা পরিবর্তন করলেই কিন্তু রাগ-জেদ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

অনেক শিশুই তার মনের ভাব সঠিকভাবে প্রকাশ করতে না পেরে জেদ করে। পছন্দ না হলে প্রতিবাদ করতে জানে না। এই ধরনের শিশুদের মানসিক বহিঃপ্রকাশ জেদের মাধ্যমেই হয়। একে বলে কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার, যা একটি বিশেষ সমস্যা। একে ডিএসএম ফাইভ সোশ্যাল কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার নামে চিহ্নিত করেছে।

পরের প্রশ্নই হল, এই ধরনের শিশুদের বিশেষ লক্ষণগুলি কী? এরা বাইরের মানুষের সঙ্গে একদমই মিশতে পারে না। যার প্রতিফলন কিন্তু স্কুলে গিয়ে অন্য ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে হতে থাকে। ক্লাসের পড়া সঠিকভাবে বুঝতে পারে না, কোনও প্রশ্ন করে না, পিছিযে পড়তে থাকে। সমস্যা যেমন আছে, তার সমাধানও কিন্তু রয়েছে। দেড়-দুবছর বযসের মধ্যে যখন শিশুদের পৃথিবীকে আবিষ্কারের বিস্ময থাকার কথা, সেই সময আনমনা, উদাস শিশু যথেষ্ট চিন্তার কারণ। শারীরিক কোনও পুষ্টির ঘাটতির জন্য হতেই পারে, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারণটা কোনও জিনঘটিত ডিসঅর্ডার বা সমস্যা।

অটিজম, এডিএইচডি, ইলেক্টিভ মিউটিজম, প্র‌্যাগম্যাটিক বা কমিউনিকেশন ডিসঅর্ডার, স্পেসিফিক লার্নিং ডিসঅর্ডার ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে যা সঠিক জায়গায় এবং নির্দিষ্ট সময়ে চিহ্নিত করা না হলে তার ফল সুদূরপ্রসারী। তাই আমার মতামত অনুযাযী, শিশুদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি মাইলফলক বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই আজকের দিনে স্মার্ট প্যারেন্টিং।