চিন দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র, বলছেন লাদাখের শিক্ষাবিদ

379

নিউজ ব্যুরো : গালওয়ান উপত্যকার নাম কারা রেখেছিলেন জানা আছে? ১৮৯৫ সালে ব্রিটিশরা এমন নামকরণ করেছিলেন। রসুল গালওয়ান নামে এক ভারতীয় কিশোর ট্রেকার কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিকের জীবন বাঁচিয়ে ছিল বলেই এমন নামকরণ। এই গালওয়ান উপত্যকাই এখন ভারত ও চিনের সম্পর্ককে উত্তপ্ত করে তুলেছে। অথচ ১৫ জুন ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল সন্তোষ বাবু উলটোটাই ভেবেছিলেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন, লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি)-এর বিভিন্ন জায়গায় একমাসব্যাপী উত্তেজনা স্তিমিত হতে শুরু করেছে। দুপক্ষের আলোচনায় উত্তেজনা কমাতে পদক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কয়েকদিন আলোচনার পর চিনারা তাঁবুটি খুলে নেয়। এরপর কর্নেল সন্তোষ বাবু একজন চিনা অফিসারের সঙ্গে কথাও বলেন। কিন্তু ১৪ জুন অপ্রত্যাশিতভাবে আবার চিনারা ক্যাম্প তৈরি করে। ১৫ জুন বিকেল ৫টা নাগাদ সন্তোষবাবু ঠিক করেন, নিজে গিয়ে পরিস্থিতি দেখবেন। তাঁর মনে হয়েছিল, কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। সাধারণত এই ধরনের পরিস্থিতিতে মেজর স্তরের একজন কোম্পানি কমান্ডারকে পাঠানো হয়। কিন্তু কর্নেল বাবু কোনও তরুণ অফিসারকে পাঠাতে চাননি। মনে রাখতে হবে, তখনও পর্যন্ত উত্তেজনা বাড়ার কোনও লক্ষণ ছিল না। ৭টা নাগাদ তিনি দুজন মেজর স্তরের অফিসার সহ ৩৫ জনের বাহিনী নিয়ে হেঁটে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তাঁদের মনোভাব ছিল অনেকটা তদন্তে যাওয়ার মতো। ঘটনাস্থলে পৌঁছে ভারতীয়রা দেখলেন, সাধারণত ওই এলাকায় যে চিনা জওয়ানরা থাকে, তারা নেই। বদলে অন্য জওয়ানরা এসেছে। ভারতীয় জওয়ানরা পৌঁছোতেই চিনা জওয়ানরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সন্তোষ বাবু যখন জানতে চান, কেন নতুন করে তাঁবু খাটানো হয়েছে তখন একজন চিনা জওয়ান এগিয়ে এসে তাঁকে ধাক্কা মারে এবং চিনা ভাষায় গালাগালি দিতে থাকে।

চিনারা যে জায়গায় তাঁবু খাটিয়েছিল তাকে বলা হয় ওয়াই জংশন। এই জায়গাটি পেট্রলিং পোস্ট ১৪-এর এক কিলোমিটার নীচে। ৯ কিলোমিটার নীচে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেসক্যাম্প। অর্থাৎ ঘটনাক্রম থেকে স্পষ্ট, চিনারা দুদেশের সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘন করেছিল। চুক্তি কার্যকর করতে কর্নেল সন্তোষ বাবু ওয়াই জংশনের কাছে পৌঁছে হতবাক হয়ে যান। কারণ চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ)-এর জওয়ানরা তাঁবু খুলতে রাজি হচ্ছে না। এরপর তর্কাতর্কি থেকে হাতাহাতি শুরু হয়। দুপক্ষের জওয়ানদের কাছেই অ্যাসল্ট রাইফেল ছিল। তা সত্ত্বেও তাঁরা ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত এক প্রোটোকল অনুযায়ী সেই রাইফেল ব্যবহার করতে পারছিলেন না। ওই প্রোটোকল অনুযায়ী, এলএসির দুকিলোমিটারের মধ্যে বন্দুক ব্যবহার করা যায় না। এই প্রোটোকল স্বাক্ষরিত হয়েছিল উত্তেজনা কমানোর লক্ষ্যে।

- Advertisement -

হাতাহাতি, ধস্তাধস্তির সময়ে এক চিনা জওয়ান কর্নেল সন্তোষ বাবুকে আক্রমণ করে। এর ফলে ভারতীয় জওয়ানদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায় এবং তাঁরা অন্তত ছয়জন চিনা জওয়ানকে মেরে ফেলেন। বাকি চিনা জওয়ানরা এলএসির ওপারে চলে যাওয়ার পর ভারতীয় জওয়ানরা তাঁবু খুলতে শুরু করেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর রাত ৯টা নাগাদ ভারতীয় জওয়ানরা দেখেন, চিনা জওয়ানরা পিপি ১৪ পোস্টের কাছে ফিরে এসেছেন। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, তারা সংখ্যায় ৩০০ জন ছিল। তাদের পরনে ছিল রাবারের পোশাক এবং তারা পাথর জড়ো করতে শুরু করেছিল। এক ভারতীয় আধিকারিক জানিয়েছেন, কোনও কিছুই স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না। চিনারা হামলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে এসেছিল। এইসব দেখেই কর্নেল সন্তোষ বাবু বেসক্যাম্পে বার্তা পাঠান। তারপর ৪০ জন জওয়ানকে পাঠানো হয়। এরপর ৫ ঘণ্টা ধরে যা ঘটেছে, এক জওয়ানের মতে তা ছিল মধ্যযুগীয় বর্বরতা। চিনারা হামলা চালানোর সময়ে মধ্যযুগীয় অস্ত্র ব্যবহার করে। চিনারা সন্তোষ বাবুর মাথায় আঘাত করার পর তিনি ২০ ফুট নীচে পড়ে যান। অনেকের মতে, তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। যখন ভারতীয় জওয়ানরা দেখেন, তাঁদের চোখের সামনে কমান্ডিং অফিসার পড়ে যাচ্ছেন তখন তাঁরা আর নিজেদের সামলে রাখতে পারেননি। ভারতীয়রা সংখ্যায় তুলনায় কম থাকলেও তাঁদের সাহসিকতা কম ছিল না। তারপরের ঘটনা নিয়ে অনেক চর্চা হয়েছে। এক রাতের ঘটনাবলিতে ভারত-চিন সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন শুরু হয়েছে। চিন সম্পর্কে ভারতীয়দের ক্রোধ এখন নজিরবিহীন। লাদাখের শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের মতে, নৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে চিন একটি দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র।