পিছিয়ে ভারত, এশিয়ায় আমেরিকাকে টেক্কা দিতে ক্রমশ শক্তিশালী চিন

867

সিডনি ও নয়াদিল্লি : অর্থনীতি, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রথমস্থানে থাকা আমেরিকার সঙ্গে চিনের ব্যবধান খুব দ্রুত কমে আসছে। চিন এখন এসব ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থানে। কিন্তু করোনা সংক্রমণ, সহযোগী দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য-বিরোধ, একের পর এক আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ায় বিশ্ব রাজনীতিতে আমেরিকা ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়ার সুযোগ নিচ্ছে চিন। ভারত সহ বাকি দেশগুলিকে অনেকটাই পিছনে ফেলে দিয়েছে কমিউনিস্ট দেশটি। এ সবই ঘটেছে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর। অস্ট্রেলিয়ার পর্যবেক্ষক সংস্থা লই ইন্সটিটিউটের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে এশিয়ায় ক্ষমতা বিন্যাসকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, তা ভারতের পক্ষে যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে। সিডনি ভিত্তিক পর্যবেক্ষক সংস্থাটির ২০২০ সালে এশিয়া পাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি হিসাবে আমেরিকার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী চিনের ব্যবধান দু-বছর আগে ছিল ১০ পয়েন্ট। বর্তমানে তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। এভাবে চললে ২০৩০-এর মধ্যে আমেরিকাকে ছাপিয়ে এশিয়ায় বৃহত্তম সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসাবে উঠে আসবে চিন। ওই সময় ভারতের অর্থনীতি চিনের মাত্র ৪০ শতাংশ হতে পারে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে। সমীক্ষক দলের প্রধান তথা লই-র এশিয়ান পাওয়ার অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাটিক প্রোগ্রামের ডিরেক্টর হার্ভে লেমাহিউইয়ের মতে, ক্ষমতায় আসার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের একের পর এক সিদ্ধান্ত বিশ্বশক্তি হিসাবে আমেরিকার অবস্থানকে ক্ষুণ্ণ করেছে। এশিয়ার আর্থ-রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে যার প্রভাব পড়েছে। গত ৪ বছরে বাণিজ্য নিয়ে সহযোগী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছে আমেরিকা। যে বহুপাক্ষিক চুক্তিগুলির দৌলতে দেশটি এতদিন বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রেখেছিল, বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার কয়েটি থেকে সরে এসেছেন। ফলস্বরূপ সমমনোভাবাপন্ন দেশগুলির সঙ্গে আমেরিকার দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

লেমাহিউই বলেন, আমেরিকার সমস্যা একধাক্কায় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে করোনা সংক্রমণ। উহান থেকে ছড়ানো এই ভাইরাস আমেরিকাকে শুধু আর্থিক দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, কূটনীতিতেও এর গভীর প্রভাব ফেলেছে। বন্ধু ও প্রতিপক্ষদের কাছে আমেরিকার প্রভাব-প্রতিপত্তি মারাত্মক রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ব্যর্থতার ফলে। সেই সুযোগে আমেরিকার সঙ্গে ব্যবধান দ্রুত কমিয়ে ফেলেছে চিন। এশিয়ায় চিন কতটা আগ্রাসী হয়ে উঠেছে, তা গত কয়েক মাসে বিভিন্ন দেশে চিনা রাষ্ট্রদূতদের বিবৃতি থেকে স্পষ্ট। ওইসব বিবৃতির অনেকগুলিতে বিভিন্ন দেশকে নজিরবিহীনভাবে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। কয়েক বছর আগেও চিনের এধরনের অবস্থান ভাবা যেত না। আমেরিকার দুর্বলতা এশিয়ায় চিনের প্রতিপত্তি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে লেমাহিউই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, চিন সম্ভবত এই দশকের শেষ দিকে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাবে। যদিও দু-দেশের মধ্যে আর্থিক সামর্থ্যের ফারাক খুব কম থাকবে। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে এশিয়ার দেশগুলিকে আমেরিকার সাহায্য ছাড়াই চিনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। লেমাহিউইয়ের যুক্তি, আর্থিক সঙ্কটের কারণে আমেরিকা অচিরে বিভিন্ন দেশ থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হবে। সহযোগী রাষ্ট্রগুলিকে সাহায্য দেওয়ার পরিমাণ কমিয়ে আনবে। ভবিষ্যতে এশিয়ায় চিনকে ঠেকানোর ক্ষেত্রে আমেরিকার ভূমিকা সঙ্কুচিত হয়ে যাবে।

- Advertisement -

এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারকারী দেশ হিসাবে পাওয়ার ইনডেক্সে জাপানের পিছনে চতুর্থস্থানে রয়েছে ভারত। সমীক্ষক সংস্থার মূল্যায়নে, আয়তন ও সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাপান কার্যকরভাবে নিজের অবস্থানকে মজবুত করতে পেরেছে। সেই তুলনায় এশিয়ার মহাশক্তি হিসাবে উঠে আসার ব্যাপারে ভারতের অনুমানের চেয়ে বেশি সময় লাগতে পারে। লেমাহিউই বলেন, করোনা সংক্রমণ ভারতের অর্থনীতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আগামী দিনে দারিদ্র‌্য ভারতের বিকাশের পথে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়াবে। রাষ্ট্রসংঘের ওয়ার্ল্ড ইন্সটিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট ইকনমিকস রিসার্চের প্রতিবেদনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় প্রায় ৩৫ কোটি মানুষের দারিদ্র‌্যসীমার নীচে নেমে যাওয়ার আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। ভারতীয় অর্থনীতিতে এই দারিদ্র‌্যের গভীর প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অস্ট্রেলীয় সমীক্ষক সংস্থার রিপোর্টেও কার্যত একই কথা জানানো হয়েছে। পাওয়ার ইনডেক্সে প্রথম ১০-এ থাকা বাকি দেশগুলি হল রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও মালয়েছিয়া। আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির নিরিখে ইতিবাচক অবদান রাখতে পেরেছে অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েনাম ও তাইওয়ান। অন্যদিকে, আমেরিকার পাশাপাশি রাশিয়া ও মালয়েছিয়ার অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।