চিনের নজর শিলিগুড়িতে, প্রতিরক্ষায় এনএসজির মহড়া

8030

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : চিনা ড্রাগনের নিঃশ্বাস শিলিগুড়িতে। লাদাখ সীমান্তে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর নতুন করে কমিউনিস্ট শাসিত চিনের নজর পড়েছে দার্জিলিং জেলার সমতলের এই শহর ও সংলগ্ন এলাকায়। প্রতিরক্ষা নিরাপত্তা সংক্রান্ত ম্যাপে এই এলাকা শিলিগুড়ি করিডর নামে চিহ্নিত। একপাশে নেপাল, অন্যপাশে ভুটান। দূরে নয় চিন। দক্ষিণদিকে আবার বাংলাদেশ। চওড়ায় মাত্র ২২ কিলোমিটার আর দৈর্ঘ্যে ৬০ কিলোমিটারের এই করিডরটি ছিন্ন হয়ে গেলে উত্তরবঙ্গ তো বটেই উত্তর-পূর্ব ভারতের ৮ রাজ্যই প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে বিপন্ন হয়ে পড়বে। বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ বলে এই অঞ্চলে তিনটি সেনাশিবির আছে সুকনা, ব্যাংডুবি ও সেবকে। হাসিমারায় বায়ুসেনা ঘাঁটিও তৈরি করা হয়েছিল চিনের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের কথা ভেবেই। লাদাখে সুবিধা করতে না পেরে এখন ভিন্ন কৌশলে ভারতকে চাপে রাখার পরিকল্পনা করছে চিন।

চিনের নজর শিলিগুড়িতে, প্রতিরক্ষায় এনএসজির মহড়া| Uttarbanga Sambad | Latest Bengali News | বাংলা সংবাদ, বাংলা খবর | Live Breaking News North Bengal | COVID-19 Latest Report From Northbengal West Bengal Indiaশিলিগুড়ি করিডর সেই কৌশলের অন্যতম নিশানা। এই করিডরটি চিকেন নেক করিডর নামেও পরিচিত, আকারে অনেকটা মুরগির গলার মতো দেখতে বলে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সূত্রে খবর, সম্প্রতি সিকিম ও ভুটানের মাঝে তিব্বতের স্বশাসিত এলাকা চুম্বি ভ্যালিতে চিনা সেনার কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিমধ্যে সেনাছাউনি ও বায়ুসেনা ঘাঁটিতে বাড়তি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করা শুরু হয়েছে। সুকনা, ব্যাংডুবি এবং সেবক সেনাছাউনির মধ্য দিয়ে অবাধ সিভিলিয়ান যাতায়াত চালু আছে। নিরাপত্তার খাতিরে সেই যাতায়াতের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এখন। তিনটি সেনাছাউনি এলাকাতেই রাতে ও ভোরের দিকে চলাচলকারী সন্দেহভাজন গাড়িতে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। ফ্রান্স থেকে আনা রাফায়েল য়ুদ্ধবিমানের কয়েকটি হাসিমারাতে আনার সিদ্ধান্ত এই ঝুঁকির কথা ভেবেই। সেনা সূত্রে খবর, ২০২১ সালের মাঝামাঝি দুটি রাফায়েল হাসিমারায় আনা হতে পারে।

- Advertisement -

শিলিগুড়ি করিডরের কাছেই সিকিম। এই রাজ্যটি চিন সীমান্ত রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত রক্ষার দায়িত্বে আছে ভারতীয় সেনার ত্রিশক্তি কর্পস (৩৩ কর্পস)। সুকনায় এই বাহিনীর সদর দপ্তর আবার শিলিগুড়ি করিডরের মধ্যে পড়ে। গ্যাংটক ছাড়া দার্জিলিং জেলার কালিম্পং ও জলপাইগুড়ির বিন্নাগুড়িতে কর্পসের আরও দুটি দপ্তর আছে। সেখানেও সেনা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে খবর। গ্যাংটক ও কালিম্পং দপ্তরে বেশ কিছু বাছাই করা সেনা গোয়েন্দাদের পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে চিনের কৌশল জানার পর ভারত শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা রক্ষায় ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি)-কেও মোতায়েন করেছে বলে সেনা সূত্রে খবর মিলেছে। এনএসজি জওয়ানরা ইতিমধ্যে মহড়া শুরু করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলটিতে। এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি শিলিগুড়িতে মহড়া দিয়েছিল এনএসজি কমান্ডোদের বিশেষ দল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক সূত্রের খবর, চলতি মাস থেকেই অরুণাচল প্রদেশেও মহড়া শুরু হয়েছে। শিলিগুড়ি ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় এই মহড়া চলবে। শত্রুপক্ষ হঠাৎ আক্রমণ করলে মোকাবিলার অনুশীলন করতেই এই মহড়া। মহড়ায় রাজ্য পুলিশ, এসএসবি, বিএসএফ, অসম রাইফেলস, রেলের নিরাপত্তাবাহিনীর বাছাই করা আধিকারিকদেরও অংশগ্রহণের বন্দোবস্ত করা হচ্ছে। শিলিগুড়ির সিটি সেন্টার, বাগডোগরা বিমানবন্দর, সাফারি পার্ক, নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশনকে প্রাথমিকভাবে মহড়ার জন্য বাছা হয়েছে বলে সেনা সূত্রের খবর। শুধু সেনাবাহিনী নয়, এসএসবি, বিএসএফ, অসম রাইফেলস এবং সমস্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে শিলিগুড়ি করিডরের বিষয়ে অতিসতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। সতর্ক করা হয়েছে রেল কর্তৃপক্ষকেও। কেননা, সড়কপথ মূল লক্ষ্য হলেও আঘাত আসতে পারে রেলপথের ওপর। কিংবা আঘাত হানার জন্য রেলপথকে ব্যবহার করা হতে পারে।  যে সড়কপথকে ছিন্ন করার পরিকল্পনা চিনের আছে, সেটি হল ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক। আরও কয়েকটি রাজ্যের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের অন্তত ৫টি জেলার লাইফলাইনও বটে এই সড়কটি। শিলিগুড়ি শহর ঘেঁষে এই সড়কটি চলে গিয়েছে উত্তর-পূর্ব ভারতে। সেখানকার রাজ্যগুলির শুধু দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর জন্য নয়, প্রতিরক্ষা রসদ সরবরাহেরও একমাত্র পথ এই ৩১ নম্বর জাতীয় সড়ক। চারটি দেশ দিয়ে ঘেরা শিলিগুড়ি করিডরের এই সরু অংশ কোনওভাবে চিন কবজা করতে পারলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে। উত্তর-পূর্ব ভারত তো বিচ্ছিন্ন হবেই, ভারত-ভুটান সড়ক যোগাযোগও থাকবে না। নেপালের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগও এই করিডরের মধ্যে আছে। সেনা সূত্রের খবর, শিলিগুড়ি করিডরকে অতি স্পর্শকাতর এলাকা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক থেকে বার্তা পাঠানো হয়েছে উল্লিখিত বাহিনীগুলির কাছে। সেনাবাহিনীর ইস্টার্ন কমান্ডের এক কর্তা জানিয়েছেন, রাজ্য পুলিশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেই সমস্ত পদক্ষেপ করা হচ্ছে।

শত্রুপক্ষের অবস্থান ও শক্তি জানতে চিকেন নেকের সুনির্দিষ্ট এলাকায় ওয়েন ট্র‌্যাকিং রাডার, আর্টিলারি লোকেশন রাডার, গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডারের মতো বেশ কিছু অত্যাধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। সম্প্রতি চিকেন নেকের গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত রাজ্য ও জাতীয় সড়কের পরিস্থিতি, রেল পরিষেবার হাল জানিয়ে বিস্তারিত একটি রিপোর্ট সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রতিরক্ষামন্ত্রককে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। যদিও ওই বিষয়ে কোনও সেনা আধিকারিক মন্তব্য করতে চাননি।