চিনা সংস্থার নজরে মোদি-মমতা

1592

নয়াদিল্লি: চিনের সঙ্গে ভারতের বিরোধ আর সীমান্তে আটকে নেই। নজরদারি শুরু হয়েছে ভারতের বিশিষ্টদের ওপর। সেই তালিকায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর মতো দেশের শীর্ষ পদাধিকারীরা যেমন আছেন, তেমনই রয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শচীন তেন্ডুলকরের মতো ক্রীড়া ব্যক্তিত্বও। চিনা সরকার ও চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত শেনঝেনের একটি প্রযুক্তি সংস্থা অন্তত ১০ হাজার প্রভাবশালী ও বিশিষ্ট ভারতীয়ের ওপর নজরদারি চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই নজরদারিকে বলা হচ্ছে হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার। ভারতের একটি ইংরাজি দৈনিকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য ফাঁস হয়েছে। দিল্লির পক্ষ থেকে চিনের এই পদক্ষেপ অপ্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করে জানানো হয়েছে, ভারতীয় গোয়েন্দা দপ্তরের কাছে সব খবরই আছে। সীমান্তে বাধা পাওয়ার পর এটা ঘটবে বলে জানাই ছিল। চিনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করার কারণ তো মূলত এটাই ছিল যে, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশটি ভারতের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে আঘাত করছে। গালওয়ান উপত্যকায় সংঘাতের জের প্রথমে পড়েছিল সাইবার দুনিয়ায়। মে মাসে সংঘাত শুরু হওয়ার পর গত দুমাসে তিন দফায় দুশোর বেশি চিনা অ্যাপ বাতিল করে ভারত।

পূর্ব লাদাখে দুদেশের সংঘাত এখনও চলছে। এমন পরিস্থিতিতে চিনা তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলির এই নজরদারির খবর সামনে এল। প্রতিবেদনের তথ্য সত্য হলে, এই নজরদারির আওতায় রয়েছেন, সমাজের বিভিন্ন স্তরের অন্তত ১০ হাজার বিশিষ্ট, এমনকি তাঁদের পরিবারের সদস্যরাও। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঝেনহুয়া ডেটা ইনফর্মেশন টেকনোলজি কোম্পানি নামে ওই সংস্থাটি তথ্য সরবরাহ করে চিন সরকার, চিনা কমিউনিস্ট পার্টি, চিনের সেনাবাহিনী সহ সেদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে। ফলে তাদের নজরদারি-প্রসূত তথ্য বেজিংয়ের হাতে পৌঁছেছে বলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কূটনীতিকরা আশঙ্কা করছেন। ওই তদন্তমূলক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, রাজনীতি থেকে বিনোদন, ক্রীড়া থেকে সংবাদমাধ্যম, এমনকি অপরাধী ও জঙ্গিদের সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে দক্ষিণ-পশ্চিম চিনের গুয়াংডং প্রদেশের ওই সংস্থাটি।

- Advertisement -

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিনা তথ্য প্রযুক্তি সংস্থার নজরদারির তালিকায় রয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধি, তাঁর পরিবারের সদস্যরা, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সহ দেশের বহু প্রথমসারির রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নজরদারিতে রয়েছেন রাজনাথ সিং, নির্মলা সীতারামন, স্মৃতি ইরানি, পীয়ূষ গোয়েলের মতো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। নজরে আছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নবীন পট্টনায়েক, অশোক গেহলট, উদ্ধব ঠাকরে, অমরিন্দর সিংয়ের মতো বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা। নজরদারি চলছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এসএ বোবদে, শিল্পপতি রতন টাটা, গৌতম আদানি, বিভিন্ন নিউজ চ্যানেলের সম্পাদক, ইউপিএ আমলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রাক্তন মিডিয়া উপদেষ্টা সঞ্জয় বারু এবং বিভিন্ন সাংবাদিক ও সংবাদ মাধ্যমের আধিকারিকদের ওপর। ডিএমকে, বসপা, আরজেডি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ওপরও নজরদারি চলছে।

বিশিষ্টদের পাশাপাশি কুখ্যাত জঙ্গি ও অপরাধ জগতের লোকজনের ওপরও কড়া নজর রয়েছে চিনা সংস্থার। শুধু রাজনৈতিক ও আইনপ্রণেতা জগতের ১৩৫০ জন আছে নজরদারির তালিকায়। প্রতিবেদনটির দাবি, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে ওই ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে তা প্রয়োজনমতো জানিয়ে দেওয়া হয় সংস্থার ক্লায়েন্টদের। সর্বজনীন সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক ছাড়াও নজরদারি চালানোর জন্য ঝেনহুয়ার নিজস্ব মনিটরিং ম্যাপ রয়েছে। এর নাম পার্সন ইনফর্মেশন অ্যান্ড রিলেশনশিপ মাইনিং। ঝেনহুয়ার ওয়েবসাইটে রয়েছে ওভারসিজ কি ইনফরমেশন ডেটাবেস (ওকেআইডিবি)।

গত প্রায় দুমাস ধরে সংস্থার মেটা ডেটা ও লগ ফাইল ঘেঁটে চিনা সংস্থার গোয়েন্দাগিরির খবর জানা সম্ভব হয়েছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, শুধু ভারত নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, সংযুক্ত আরব আমিরশাহির মতো বহু দেশের বিশিষ্ট ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তথ্যও সংগ্রহ করে ঝেনহুয়া। মাত্র দুবছর আগে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে অন্তত ২০টি তথ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র খুলে ফেলেছে তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ সেপ্টেম্বর সংস্থার ওয়েবসাইটে উল্লিখিত ই-মেলে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনও জবাব মেলেনি। বরং ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ঝেনহুয়ার ওয়েবসাইটটাই গায়েব হয়ে গিয়েছে ইন্টারনেট থেকে। তবে ঝেনহুয়ার কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার কথা স্বীকার বা অস্বীকার কোনওটাই করেনি চিনা দূতাবাস।

অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরার সাইবার সিকিউরিটি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রবার্ট পটারের মতো পর্যবেক্ষকদের বক্তব্য, এটা নতুন কিছু নয়। সব দেশই অন্য দেশের ওপর এরকম তথ্য সংগ্রহ করে এবং প্রয়োজনমতো গোয়েন্দাগিরি চালায়। এটা বিদেশনীতির অঙ্গ। কিন্তু প্রযুক্তির অপব্যবহার করে চিন যেভাবে ব্যক্তি ধরে ধরে বিপুল তথ্য জোগাড় করছে, তা অভূতপূর্ব এবং উদ্বেগজনকও বটে।