ট্রায়াল শেষ না করেই টিকার করোনা গণপ্রয়োগ চিনে

428

বেজিং : টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার পরে তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া ছিল না। তবে চিনে জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পরে খুব দুর্বল অনুভব করেছিলেন কান চাই। সম্প্রতি এক ওয়েবিনারে চিনের এই জনপ্রিয় লেখক বলছিলেন, রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে একদিন মাথাটা ঘুরে গেল, অনেকটা মদ খেলে যেমন হয়। তড়িঘড়ি গাড়ি থামিয়ে রাস্তার ধারে বসে বিশ্রাম নিতে কিছুটা ধাতস্থ হলাম। এমনটা আমার সঙ্গে কখনও হয়নি। চিনে কী পরীক্ষানিরীক্ষা হচ্ছে, তা জানা যায় না। করোনার টিকা নিয়ে সেখানকার অগ্রগতি ধোঁয়াশায় ভরা। চিনে করোনা নির্মূলে যেসব টিকার পরীক্ষা হচ্ছে, চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার আগেই, তার কয়েকটি গণহারে বহু মানুষকে দেওয়া হয়েছে। তাঁদেরই একজন এই কান চাই। তাঁর নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানা গিয়েছে ইন্টারনেট থেকে। মার্কিন সংবাদ সংস্থা নিউ ইয়র্ক টাইমসের দাবি, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে মরিয়া চিন সরকার টিকার কার্যকারিতা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করছে না। ট্রায়াল শেষ হওয়ার আগেই ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থার কর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক সহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের ওপর তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। কেউ যাতে এ ব্যাপারে গণমাধ্যমে মুখ না খোলেন সেজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ননডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট-এ সই করিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত কতজনকে টিকা দেওয়া হয়েছে সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া না গেলেও সংখ্যাটা কয়েক লক্ষ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

পরীক্ষার পর্যায়ে থাকা চিনা টিকার গণপ্রয়োগ নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থা সিনোফার্মের তৈরি পরীক্ষামূলক করোনা টিকা বহু মানুষকে দেওয়ার কথা জানাজানি হওয়ার পর তার নিরাপত্তা ও নৈতিকতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। চিনা পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন ইউরোপ ও আমেরিকার বিশেষজ্ঞ ও টিকা প্রস্তুতকারকরা। করোনার টিকার সম্পূর্ণ পরীক্ষা না করে তার ব্যবহারের বিপদ নিয়ে সতর্ক করে দিয়ে তাঁরা বলেছেন, গত জুলাই মাস থেকে জরুরি ব্যবহার কর্মসূচির আওতায় লক্ষাধিক মানুষকে টিকা দিয়েছে চিন। দেশের সরকার এতে অনুমোদন দিয়েছে। তবে ওই টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা এখনও ক্লিনিকাল ট্রায়ালে পুরোপুরি প্রমাণ হয়নি। যদিও চিনের দাবি,জরুরি ভিত্তিতে পরীক্ষামূলক করোনার টিকা ব্যবহারের জন্য তারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমর্থন পেয়েছে।

- Advertisement -

শুক্রবার চিনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের প্রধান ঝেং ঝংওয়ে বলেন, করোনা টিকার জরুরি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিতর্ক থাকলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তাঁরা বোঝাতে পেরেছেন এবং সমর্থনও পেয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, জুনের শেষে কোভিড-১৯ টিকার জরুরি ব্যবহারের জন্য একটি পরীক্ষামূলক পরিকল্পনা অনুমোদন করে চিনের মন্ত্রীসভা ও রাজ্য কাউন্সিল। এরপর চিনা নিযুক্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানানো হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চিনে এই মুহূর্তে অন্তত ১১টি করোনা-টিকার ক্লিনিকাল ট্রায়াল চলছে। এর মধ্যে তিনটি টিকার তৃতীয় ধাপের পরীক্ষা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে। আরও জানা গিয়েছে যে, করোনা ভাইরাসের প্রতিষেধক পাকাপাকিভাবে তৈরি না হলেও তা উৎপাদনের জন্য জোরকদমে প্রস্তুতি শুরু করেছে চিন। আগামী বছরের মধ্যে ১০০ কোটিরও বেশি কোভিড-টিকার ডোজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রেখেছে শি জিনপিং-এর সরকার। সেই লক্ষ্যে সরকারি সহায়তায় তৈরি করা হচ্ছে প্রতিষেধক তৈরির নতুন কারখানা। শুক্রবার এক সাংবাদিক বৈঠকে ঝেং ঝংওয়ে একথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, চলতি বছরেই ৬১ কোটি কোভিড টিকা তৈরি করে ফেলতে পারবে চিন। পাশাপাশি, ২০২১-এর বাৎসরিক লক্ষ্যমাত্রাও স্থির করে ফেলেছে চিনের ক্যাবিনেট স্তরের ওই কার্যনির্বাহী দপ্তর। ঝেং ঝংওয়ের কথায়, আগামী বছর ১০০ কোটির বেশি কোভিড-১৯ টিকার ডোজ উৎপাদনের ক্ষমতা হবে আমাদের। এদিকে সাংবাদিক বৈঠকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক আধিকারিক বলেন, যেকোনও স্বাস্থ্য পণ্যের জরুরি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়ার জন্য প্রত্যেক দেশের নিজস্ব নিয়ম ও আইন রয়েছে। চিন সহ অনেক দেশ বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে এই পথে হেঁটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে জরুরি ব্যবহারের জন্য পণ্যের তালিকা রয়েছে এবং চিকিৎসার জন্য কয়েকটি পণ্য অনুমোদন দিয়েছে।