শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে চিটফান্ডের জাল ছড়াচ্ছে উত্তরবঙ্গে

254

শুভঙ্কর চক্রবর্তী, শিলিগুড়ি : আবার চিটফান্ড। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন, উত্তরবঙ্গে চিটফান্ড ফিরতে শুরু করেছে। নতুন করে প্রতারণার জাল বিছাচ্ছে ভুয়ো অর্থলগ্নি সংস্থা। এই ব্যবসায় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার অনুমোদন বাধ্যতামূলক। মাসতিনেক ধরে শিলিগুড়ি শহরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডে অফিস খুলেছে এমনই একটি লগ্নি সংস্থা। গ্রাহক সেজে সেই অফিসে গিয়ে এই প্রতিবেদক সেবির অনুমতিপত্র দেখতে চেয়েছিলেন। সংস্থার কর্তারা তেমন কোনও নথি দেখাতে পারেননি। অথচ একেবারে বোর্ড টাঙিয়ে গ্রাহক আকর্ষণ করে ব্যবসা চালাচ্ছে সংস্থাটি। ওই বাড়িতে অফিস চালাতে দেওয়ার অনুমতি কীভাবে দেওয়া হল, তার ব্যাখ্যা দিতে পারেননি শিলিগুড়ি পুরনিগমের কর্তারা।

শিলিগুড়ির ইসকন মন্দির রোডেও একই ধরনের একটি সংস্থার অফিসের খোঁজ মিলেছে। কোচবিহার, মালদা, উত্তর দিনাজপুর এবং ডুয়ার্সের বিভিন্ন এলাকা থেকে এজেন্টরা ওই অফিসে টাকা জমা করতে আসেন বলে খবর পাওয়া গিয়েছে। সারদা, রোজভ্যালির পাশাপাশি অতীতে উত্তরবঙ্গে স্থানীয় অনেক ভুয়ো লগ্নি সংস্থার ফলাও কারবার ছিল। সেসময় উত্তরবঙ্গজুড়ে সেই ব্যবসার কার্যত হেড কোয়ার্টার ছিল কোচবিহার শহর। ওই শহরে তখন একশোটিরও বেশি চিটফান্ডের হেড অফিস ছিল। বর্তমানে সেই ধরনের কারবার নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে শিলিগুড়ি থেকে। এই ধরনের কারবারে তাই নতুন করে সাধারণ মানুষের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত শতাব্দীর শেষ দুই দশকে গোটা রাজ্যের মানুষ একবার এমন প্রতারণার ফাঁদে পড়েছিলেন। ওই কারবারে আমানত করে অনেকে সর্বস্ব খুইয়েছেন। সেই অর্থ এখনও উদ্ধার হয়নি। নতুন করে ওই কারবার শুরু হওয়া তাই ফের বিপদ ডেকে আনছে।

- Advertisement -

কোচবিহার নাগরিক অধিকার সুরক্ষা মঞ্চের সভাপতি তথা আইনজীবী রাজু রায় আশঙ্কা করছেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এখনই লাগাম না টানলে কয়েক বছর পর ফের বড়সড়ো প্রতারণা ঘটতে পারে। এই নাগরিক অধিকার মঞ্চ অতীতে কোনও খরচ না নিয়ে চিটফান্ডে প্রতারিতদের হয়ে অনেক মামলা লড়েছে। পুরোনো বেআইনি লগ্নি সংস্থাগুলি সম্পর্কে সিবিআই দীর্ঘদিন তদন্ত চালাচ্ছে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে। তার নিষ্পত্তি হওয়ার আগে ফের এই কারবার শুরু হলেও প্রশাসনের তেমন গা নেই পদক্ষেপ করায়। শিলিগুড়ির পুর প্রশাসকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান অশোক ভট্টাচার্য শুধু খোঁজ নিয়ে খতিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশাসন বা পুলিশ কার্যত হাত গুটিয়ে বসে আছে। নতুন করে গজিয়ে ওঠা চিটফান্ডগুলির বিরুদ্ধে এখনও কোনও অভিযোগ কোথাও দায়ের হয়নি- এই অজুহাতে দায় এড়াচ্ছে পুলিশ ও প্রশাসন।

শিলিগুড়ির মহকুমা শাসক প্রিয়দর্শিনী এস বলেন, আমাদের কাছে কোনও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তবে সেবির অনুমোদন ছাড়া টাকা তোলা হয়ে থাকলে সেটা ঠিক নয়। আমরা খোঁজ নিয়ে পদক্ষেপ করব। শিলিগুড়ি মেট্রোপলিটান পুলিশের এসিপি পদমর্যাদার এক আধিকারিক বলেন, পুরসভার পক্ষ থেকে জানানো হলে পুলিশ নিশ্চয়ই পদক্ষেপ করবে। রায়গঞ্জের পুলিশ সুপার সুমিত কুমারের বক্তব্য, প্রতিটি থানার আইসিদের এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। অভিযোগ পেলে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ করা হবে। জলপাইগুড়ির বিভাগীয় কমিশনার অজিতরঞ্জন বর্ধন অবশ্য এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। ২০১২-১৩ সময়ে চিটফান্ডের রমরমার কালে এই একই অজুহাতে পুলিশ ও প্রশাসন দায় ঝেরে বসেছিল। তার খেসারত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। অভিযোগ না পেলে পদক্ষেপ করা যাবে না বলে প্রশাসনের যুক্তি অবশ্য মানতে নারাজ পূর্বতন চিটফান্ডগুলির বিরুদ্ধে মামলায় প্রতারিতদের পক্ষের আইনজীবী আহসান হাবিব। তাঁর বক্তব্য, কোনও অভিযোগ জমা না পড়লেও পুলিশ বা প্রশাসন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে। অতীতে চিটফান্ডে প্রতারিতদের হয়ে আন্দোলন করেছে চিটফান্ড সাফারার্স অ্যান্ড এজেন্টস ইউনিটি ফোরাম। নতুন করে বেআইনি অর্থলগ্নি ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত সম্পর্কে তারাও সম্যক অবহিত। এই সংগঠনের আহ্বায়ক পার্থ মৈত্র জানিয়েছেন, প্রতারণার নতুন ফাঁদে যাতে কেউ পা না দেন, তার জন্য সংগঠন ফের পদক্ষেপ করতে শুরু করেছে। এই পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে ১১ ফেব্রুয়ারি শিলিগুড়িতে বৈঠক ডেকেছে সংগঠনটি।

পার্থর হিসাবে পুলিশ, প্রশাসন হাত গুটিয়ে থাকায় ইতিমধ্যে বাজার থেকে টাকা তুলে অফিসের ঝাঁপ বন্ধ করে পালিয়েছে ১৪৭টি সংস্থা। চিটফান্ড সাফারার্স অ্যান্ড এজেন্টস ইউনিটি ফোরাম ইতিমধ্যে ওই বেআইনি সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কয়েকশো মামলা দায়ে করেছে। তবে প্রতারিতদের টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা এখনও বিশবাঁও জলে। ফোরামের পর্যবেক্ষণ, অতীতে চিটফান্ড সংস্থার ডিরেক্টর হয়ে যাঁরা সাধারণ মানুষের অর্থে ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন, তাঁরাই নতুন করে প্রতারণার এই কারবারে নেমেছেন। কিন্তু সেবির অনুমোদন না নিয়ে বিভিন্ন শহরে প্রকাশ্যে অফিস খুলে কীভাবে চলছে নতুন এই কারবার? উত্তরবঙ্গ সংবাদের পক্ষে সরেজমিনে তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রথমে সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন আইনে সংস্থার নাম নথিভুক্ত করছে সংস্থাগুলি। তারপর কোনও ব্যবসার নাম করে গ্রাম পঞ্চায়েত বা পুরসভার কাছ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে অফিস খুলে শুরু করছে অর্থলগ্নির এই বেআইনি কারবার। সোসাইটি আইনের রেজিস্ট্রেশনকেই বাজার থেকে টাকা তোলার বৈধ সার্টিফিকেট হিসাবে দাবি করা হচ্ছে।  আইনজীবী আহসান হাবিব মনে করেন, এই কারবার অঙ্কুরেই ঠেকানো যায় পুরসভা ও গ্রাম পঞ্চায়েত সতর্ক থাকলে। তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার আগে গ্রাম পঞ্চায়েত বা পুরসভাকে সমস্ত সংস্থার প্রতিটি কাজকর্ম খতিয়ে দেখা উচিত। এক ব্যবসার নাম করে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে অন্য কোনও কারবার চালানো হচ্ছে কি না, সেটা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। টাকা তোলার কাজে নিয়োগ করা হচ্ছে চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘোরা বেকারদের। কর্মসংস্থানের অন্য কোনও উপায় না থাকায় বেকাররা উপার্জনের আশায় এই কাজ করছেন। দেড় দশক আগে এভাবেই শুরু হয়েছিল চিটফান্ডের ব্যবসা। মোটা কমিশনের পাশাপাশি চার চাকার গাড়ি, মোটরবাইক, ল্যাপটপ, মোবাইল ইত্যাদি নানা উপহার দিয়ে এজেন্টদের হাতে রাখা হচ্ছে। জনমনে আস্থা সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীদেরও উপহার দেওয়া হচ্ছে। মধ্যবিত্তরা এই কারবারের মূল টার্গেট।

২০০৮ সালে বিভিন্ন প্রোডাক্ট বিক্রির চেইন মার্কেটিং বিজনেসের হাত ধরে বেআইনি কারবারের রমরমা শুরু হয় উত্তরবঙ্গে। শুরু হয় অনলাইনে ঘণ্টায় ঘণ্টায় টাকা দ্বিগুণ করার আজব কারবার। উত্তরের গ্রামগঞ্জে প্রথম হাতে হাতে ঘুরতে থাকে ল্যাপটপ। রাতারাতি একদল মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হয়ে যায়। মেঠো রাস্তায় শুরু হয় চার চাকার দাপাদাপি। সেই কারবার নিভু নিভু হতেই বাজার ছেয়ে গিয়েছিল ভুয়ো অর্থলগ্নিকারী সংস্থায়। একবছরে দ্বিগুণ, তিনমাসে লগ্নি ৫০ শতাংশ বেশি করে দেওয়া, ফিক্সড ডিপোজিট রাখলে অবিশ্বাস্য কমিশন, দামি উপহার ইত্যাদি ফাঁদে সেসময় পা দেয়নি, এমন মানুষ কমই ছিল। সারদা, রোজভ্যালির মতো বড় সংস্থা ছাড়াও তিনশোটিরও বেশি অর্থলগ্নিকারী সংস্থার কারবার ছিল উত্তরবঙ্গে। হদিস মেলে। বাজার থেকে শয়েশয়ে কোটি টাকা তুলে ঝাঁপ বন্ধ করে পালিয়ে যায় সংস্থাগুলি। পথে বসেন বহু মানুষ। এখন সেই একই ধাঁচে উত্তরবঙ্গে ফের ব্যবসা শুরু হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।