আমাদের মধ্যে চুনীই সেরা, স্মৃতিচারণায় বলরাম

তুলসীদাস বলরাম : এমনিতে বিকেল থেকে সন্ধ্যা গড়ানোর মুখে আমার গত বেশ কয়েক বছরের রুটিন উত্তরপাড়ায় গঙ্গার ধারে নিজের বাড়ির সামনে হাঁটা। কিন্তু লকডাউনে এখন সেসব বন্ধ। ওই সময়টাতেও ঘরে বসে টিভি দেখছি। আর এদিন তখনই টিভিতে ভয়ঙ্কর খবরটা শুনলাম। চুনী আর নেই!

মাত্র দিন চল্লিশের মধ্যে প্রদীপ আর চুনী-আমার প্রায় গোটা ফুটবলজীবনের নিঃসন্দেহে দুই সর্বশ্রেষ্ঠ সতীর্থ, বন্ধু, সঙ্গী যা-ই বলুন, চিরদিনের জন্য আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমি শোকে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছি। অথচ আমরা তিনজন কখনও এক ক্লাবে খেলিনি। তিনজনে এক টিমে যা খেলা সব ইন্ডিয়ার জার্সিতে। তবু ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগানের চিরকালের আকচাআকচির বাজারেও ভারতীয় ফুটবলে সর্বকালের সেরা ত্রিভুজ বলা হয় আমাদের তিনজনকেই।

- Advertisement -

পিকে-চুনী-বলরাম।

তাহলেই বুঝুন আমাদের মধ্যে কী দুর্ধর্ষ বোঝাপড়া ছিল! আর সেটা শুধু মাঠের ভেতরেই নয়, মাঠের বাইরেও ছিল সমান। বয়সেও আমরা প্রায় সমান। প্রদীপ আর আমি ৮৪, চুনী দুবছর কম। ৮২ বছর। ওরা দুজন চলে গেল। এবার বোধহয় আমার ডাক আসার পালা! চিরদিন অজস্র মানুষ জানতে চেয়েছে, আমাদের তিনজনের মধ্যেও সেরা কে ছিল? বিষয়টা এতদিন আমি এড়িয়ে গেলেও আজ আর না বলে থাকতে পারছি না। চুনী গোস্বামীই সেরা। একনম্বর!

একসঙ্গে ড্রিবল করতে করতে প্রচণ্ড গতিতে ২৫-৩০ গজ মাঠ কভার করতে পারত। আর সেটা অনায়াসে করত। আমি দুপায়ে ড্রিবল করতে পারলেও ওরকম স্পিডে এগোতে পারতাম না। অনেকটা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ড্রিবল করতাম। প্রদীপের আবার প্রচণ্ড গতি আর দুই পায়ে ভয়ঙ্কর শট থাকলেও চুনী বা আমার মতো ড্রিবলিং ছিল না।

চুনীর ভলিও ছিল অন্যতম অস্ত্র। বাষট্টির এশিয়ান গেমসের সেমিফাইনালে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে মাথা ফাটা, ব্যান্ডেজ বাঁধা- সেই অবস্থায় প্রচণ্ড শটে যে দুটো গোল করেছিল, আজ ৫৮ বছর পরেও স্পষ্ট মনে আছে আমার। যা শুধু চুনীর অসাধারণ স্কিল নয়, ওর প্রচণ্ড সাহস আর লড়াকু মনেরও পরিচয় দেয়।

আর স্কিল? প্রতিভা? চুনীর ফুটবল দেখে ওকে টটেনহ্যাম হটস্পার অফার দিয়েছিল। তার থেকেও আমার কাছে বেশি গুরুত্বের, একটাই লোক ভারতের ফুটবল ক্যাপ্টেন হয়ে এশিয়ান চ্যাম্পিয়ন, আবার ক্রিকেটে বাংলার অধিনায়ক হিসেবে রঞ্জি রানার্স! ওই ছয়ের দশকে ওয়ান ডে ফর্ম্যাট থাকলে চুনী হাসতে হাসতে ভারতের হয়ে ক্রিকেটটাও খেলত। আমি একশো ভাগ নিশ্চিত।

আমাদের দেশের সমস্ত খেলাধুলোর ইতিহাসে সর্বকালের একজন তারকা, সত্যিকারের স্টার চুনী গোস্বামী। কোনো সন্দেহই নেই। এখানে উত্তমকুমার, বম্বেতে রাখী-ওয়াহিদা রহমানরা রীতিমতো বন্ধু ছিল চুনীর। সন্তোষ ট্রফি খেলতে গিয়ে চুনীর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়, এমনকী প্রথম দেখা যখন, তখনই ও একজন স্টার! সবমিলিয়ে আমার মতে, চুনীই আমাদের দেশের সেরা ক্রীড়াবিদ। আর এটা আমি বিশ্বাস থেকেই লিখছি। (সাক্ষাৎকার ভিত্তিতে)