ঝলমলে সার্কাস অতীত, মাছ বিক্রি করেন সারদা

589
প্রতীকী ছবি

শিলচর : সার্কাসের সেই আলো ঝলমলে দিনগুলি এখন যেন স্বপ্নের মতো মনে হয় সারদার। সেই ছোট থেকে পেটের দায়ে সার্কাস পার্টিতে যোগ দেওয়া। তারপর থেকে ৩৪ বছর এই সার্কাসই ছিল তাঁর ঘরবাড়ি। ছিলেন যেন রানির মতো। এক একটা খেলা দেখাতেন, আর হাততালিতে গ্যালারি ভরে যেত। কিন্তু করোনা ও লকডাউন জীবনটাই বদলে দিয়েছে সারদা সিংহর। কলকাতাকেন্দ্রিক এক সার্কাস দলে তিনি মুখ্য খেলোয়াড় ছিলেন। করোনা ৪৫ বছর বয়সি সারদাকে মেছুনিতে পরিণত করেছে। শিলচরের রাস্তার ধারে এক বাজারে মাছ বিক্রি করেন তিনি। তবে শুধু তিনি নন, সার্কাসের জোকার থেকে শুরু করে জাগলার, ট্রাপিজের খেলোয়াড়, রিং মাস্টার, টেকনিশিয়ান, মিউজিশিয়ান, মেক-আপ আর্টিস্ট এমনকি তাঁর স্বামী রতনকেও দিনমজুরে পরিণত করেছে করোনা।

১৬০ সদস্যের সার্কাস দলটি পশ্চিমবঙ্গ, অসম ঘুরে জানুয়ারি মাসে দক্ষিণ অসমের হাইলাকান্দিতে গিয়েছিল রবীন্দ্র মেলায়। সেখান থেকে জানুয়ারির শেষে গোটা দলটি চলে যায় করিমগঞ্জের নেতাজি মেলায়। পরের মাসে তারা অসমের অন্যতম বাণিজ্য শহর শিলচরের গান্ধিমেলায় আসে। তারপরই করোনা সংক্রমণের জেরে শুরু হয় লকডাউন। রতন বলেন, শুরুর দিকে সার্কাস কোম্পানি ডিকে এন্টারপ্রাইজের কলকাতার মালিক টাকাপয়সা দিয়ে সার্কাস দলের লোকদের সাহায্য করছিলেন। বলেছিলেন, কাজ খুঁজে নিতে। কারণ, এই অবস্থায় তিনি দলের এতজনের পেট চালাতে পারবেন না। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই টাকাও বন্ধ হয়ে গেল। আমাদের সঙ্গীসাথিদের কারও কাজও জুটল না, টাকাও রইল না। শুরু হল উপোস করা। আমাদের জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল। স্বপ্নগুলো চুরমার হয়ে গেল।

- Advertisement -

রতন বলে চলেন, জানেন, আমাদের সার্কাস দলটা ঠিক যেন ভারতবর্ষের একটা ছোট্ট রূপ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধরনের মানুষের এক বিচিত্র মেলবন্ধন ছিল। কত বছর ধরে আমরা একসঙ্গে থাকি, খাই। আমরা সবাই এক পরিবারের লোক হয়ে গিয়েছি। সারদা সার্কাসে যোগ দিয়েছিলেন ১১ বছর বয়সে। এখন দুই কন্যার জননী। তিনি বললেন, ৩৪ বছর ধরে আমরা একসঙ্গে থেকেছি। বাংলা, অসম ও অন্যান্য রাজ্যে একসঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছি। তারপর একদিন রতনের প্রেমে পড়লাম। বিয়ে হল।

সার্কাস দলে এই ১৬০ জন নারী-পুরুষ ও তাঁদের ছেলেমেযো এখন অসহায় দিনয়াপন করছেন। সার্কাসের যন্ত্রপাতি, বড় মই আর অন্যান্য জিনিসপত্র রয়েছে শিলচরের দুটি সরকারি স্কুলের মাঠে। সার্কাস দলের খেলোয়াড় আকবর আলি বললেন, কাছার জেলা প্রশাসন বলেছে, আমাদের বাংলায় ফেরার ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে বা কী করব? কী আছে সেখানে? আমাদের বাড়িঘরও তো আর নেই। তার থেকে এই দক্ষিণ অসমেই থেকে যাওয়া ভালো। কারণ, এখানকার মানুষের থেকে আমরা অনেক ভালোবাসা আর সাহায্য পেয়েছি। আমাদের আশা, একদিন আবার সার্কাস চালু হবে। আবার আমরা খেলা দেখাব। গ্যালারিতে হাততালি পড়বে। সার্কাস দল সাধারণত শীত ও শরতে দিনে দুটি করে শো করে। দশ-পনেরো দিন বা একমাস অন্তর তারা জায়গা বদল করে তাঁবু ফেলে। কাজের ওপর নির্ভর করে কর্মচারীরা কেউ পান ১০ হাজার টাকা, কেউ বা মাসে ২৫ হাজার। সরকার বহু আগেই বেশকিছু জন্তু-জানোয়ার নিয়ে খেলা দেখানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এতে সার্কাসের ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই কমে গিয়েছে। যেটুকু বাকি ছিল কফিনে শেষ পেরেকটুকু পুঁতে দিল করোনা।