মহানন্দায় নৌকা নিয়ে রতন মাঝি। ছবি : সূত্রধর

শিলিগুড়ি : শিলিগুড়ি শহরের মধ্যে যে একখণ্ড গ্রাম আছে এটা কোনো গল্পকথা নয়। ওই গ্রামে থাকেন রতন মাঝি। তিনিই এলাকার যোগাযোগের কান্ডারি। মহানন্দা নদীতে জল বাড়লে তাঁর ডাক পড়ে। সেই কোন ছোটোবেলায় বাবা-মা আদর করে নাম দিয়েছিলেন রতন। সেই রতন সরকারই মহানন্দাকে ভালোবেসে হয়ে গিয়েছেন রতন মাঝি। এলাকার সমস্ত মেয়ে একসময় মশকরা করে গলা ছেড়ে তাঁকে ডাকত সুজন মাঝি বলে। রতন মাঝি যেন গানের সেই সুজন মাঝি যে পার করে দেবে বলে মেয়েরা নদীর পাড়ে বসে থাকত। সেই রতন মাঝি বছরের পর বছর প্রতিবেশীদের অনুরোধে বাঘা যতীন কলোনির সঙ্গে মহানন্দা নদীর উলটো পারের লক্ষ্মী কলোনির মধ্যে সংযোগস্থাপন করে চলেছেন। বর্ষার তিনমাস পেট চালানোর পেশা ছেড়ে নৌকার হাল ধরেন, অনেকে হাজিরাটুকু উঠিয়ে দিতে কিছু পয়সাও দেন নদীপারাপারের জন্য। আধুনিকতার ছোঁয়া লাগা শহরের মধ্যে সুখ-দুঃখের এই নৌকা পারাপারের মধ্যেই কোথাও যেন মাঝি-জীবন নদীর স্রোতে সঙ্গে মিশে যায়। এভাবেই কি বছরের পর বছর চলে যাবে। নদীতে সেতুর কাজ শুরু হওযার প্রতিশ্রুতি কি কোনোদিন পূরণ হবে না?

শিলিগুড়ি পুরনিগমের ৪৪ নম্বর ওযার্ডের লক্ষ্মী কলোনিতে দুটি ঘাট রয়েছে। একটি ঘাটের উলটোদিকে বাঘা যতীন কলোনি এবং অন্য ঘাটের উলটোদিকে রয়েছে মুক্তমঞ্চ। এরমধ্যে বাঘা যতীন কলোনি যাওযার ঘাটটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই কলোনি দিয়ে জংশন, প্রধাননগরে ওঠার সুবিধা রয়েছে।

অন্যদিক দিয়ে সেবক রোডে ওঠার সুবিধা থাকায় বহু বছর ধরে সাধারণ মানুষ এখান দিয়ে নদী পারাপার করেন। প্রথম থেকেই এলাকায় সেতুর দাবি রয়েছে। এলাকাবাসীর পারাপারে নদীর সঙ্গে রতনের নৌকা ও তাঁর নিকট আত্মীয় অনাথ সরকারের এই সম্পর্ক প্রায় ৪০ বছরের। ভানুনগরের বাসিন্দা অনাথ সরকার এলাকাবাসীর সুবিধার জন্য সেসময় এই নৌকাটি তৈরি করে ব্যবহার শুরু করেছিলেন। সেই থেকে প্রতি বছরই তিনি নিয়ম করে বর্ষায় নৌকা চালাতেন। এরমধ্যেই বছর তেরো আগে তিনি রতনকে শহরে নিয়ে আসেন।

এদিকে, সেতুর দাবিতে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ে মাঝেই জীবনযুদ্ধে হার মানেন অনাথ। বর্ষায় প্রতিবেশীদের নদী পারাপারের দায়িত্ব এসে বর্তায় রতনের উপর। পেশায় রাজমিস্ত্রি রতন সরকার বলেন, ছোটোবেলায় ধূপগুড়িতে থাকাকালীন নৌকা চালানো শিখেছিলাম। শিলিগুড়িতে আসার পর অনাথবাবুও শেখাতেন। অনাথবাবু মারা যাওয়ার পর দুপারের বাসিন্দারা এই দায়িত্ব আমাকে নেওযার অনুরোধ করেন। তবে অনাথবাবুর মতন এতটা পারদর্শী না হওয়ায় বর্ষায় নদীতে বেশি জল এলে নৌকা চালানো বন্ধ রাখি। কিন্তু কতদিন আমাদের এই ভাবে নদীপারাপার করে যেতে হবে।

একই কথা লক্ষ্মী কলোনির বাসিন্দা অরুণ রায়ের। তিনি বলেন, রতন আমাদের কথায় বর্ষায় নৌকাটি চালানোয় একটু সুবিধা হয়। কিন্তু রতনের পাশাপাশি আমরা প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ এভাবে কতদিন চলব। নয় বছর আগে বর্তমান মেয়র অশোক ভট্টাচার্য রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী থাকাকালীন সেতুর জন্য একবার এলাকার মাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল। যদিও তারপর কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সময়ে ভোটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দলের তরফে শুধু প্রতিশ্রুতিই দেওয়া হয়েছে। ওযার্ড কাউন্সিলারও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

পুরনিগমের ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কাউন্সিলার প্রীতিকণা বিশ্বাস বলেন, আমরা ইতিমধেই পুরনিগমের তরফে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরে সাধারণ মানুষের এই সমস্যার সমাধানে সেতু তৈরির প্রস্তাব দিয়েছি। আশা করছি, দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান হবে।