রণজিৎ ঘোষ, শিলিগুড়ি : মাটিগাড়ায় বালাসন নদীর বাঁধ দখল করে গড়ে উঠেছে আস্ত একটি গ্রাম। সেখানে অন্যদের সঙ্গে বাড়ি তৈরি করেছেন শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের এক কর্মচারীও। বর্তমানে বাঁধ ছাপিয়ে প্রায় নদীর ধার পর্যন্ত বাড়ির পাঁচিল বা ঘরের দেয়াল চলে এসেছে।

এভাবে নদীর ধারে বসতি তৈরি করা লোকজনের কারও জমির কোনো কাগজপত্র নেই। অথচ তাঁদের বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে, এলাকায় তৈরি হয়েছে রাস্তাঘাটও। এমনকি পঞ্চায়েত তাদের থেকে কর আদায় করে বলেও জানিয়েছেন নদী দখলকারীরা। বিষয়টি নিয়ে মাটিগাড়া (২) গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান প্রিয়াঙ্কা বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘদিন আগেই এই ঘরবাড়িগুলি তৈরি হয়েছে। বাম আমলেই এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ হয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে ব্যবস্থা নিলেই এ ব্যাপারে কোনো কিছু হওয়া সম্ভব। দার্জিলিংয়ে জেলা ভমি ও ভূমিসংস্কার আধিকারিক নিবিল ঈশ্বরারি বলেন, আমি পুরো বিষয়টি নিয়ে ব্লক আধিকারিকের কাছে জানতে চাইব। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাপরাইল মোড় পেরিয়ে শিবমন্দিরের দিকে যাওয়ার সময় বালাসন সেতু পেরিয়ে ডানদিকে বাঁধ রয়েছে। ৯-এর দশকে বন্যার কথা মাথায় রেখে মাটিগাড়ার বিভিন্ন এলাকাকে বাঁচানোর জন্যই এই বাঁধ তৈরি হয়েছিল। ধীরে ধীরে এই বাঁধ দখল করে বসতি তৈরি হয়েছে। একটা-দুটো করে বাড়িঘর হতে হতে বর্তমানে এখানে প্রায় ১৫০টি বাড়ি তৈরি হয়ে গিয়েছে। এলাকার নাম হয়েছে পালপাড়া। সিংহভাগ মানুষই কুমোরের কাজ করে সংসার চালান। তবে, কিছু ব্যবসায়ীও রয়েছেন। বাঁধের নদীর দিকে পুরো ঢাল ধরে বাড়িঘর তৈরি হতে হতে একেবারে নদীর ধার পর্যন্ত চলে এসেছে। ধীরে ধীরে নদী দখলের প্রবণতা আরও বাড়ছে। কখনও বন্যা হলে বাড়িগুলি জলের নীচে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁদের কারও জমির কাগজপত্র কিছুই নেই। কিন্তু বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে, বাড়ির সামনে বেডমিশালি ফেলে রাস্তাও করে দিয়েছে পঞ্চায়েত। কিন্তু কীভাবে এসব সম্ভব হয়েছে? স্থানীয গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্য সিপিএমের বিশ্বনাথ পাল বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই এই বাঁধের দুদিকে মানুষ বসবাস করছেন। তবে, ইদানীং নদীর দিকে ঘরবাড়ি আরও বাড়ানোর একটা প্রবণতা শুরু হয়েছে। এটা ভযংকর। আমি কয়েকবার বাধা দিতে গিয়েছি, প্রত্যেকবারই অকথ্য গালিগালাজ এবং ধাওয়া খেয়েছি। এখন আর কিছু বলি না।” কিন্তু তাঁদের আমলেই তো এই বাড়িগুলি তৈরি হয়েছে, এই অভিযোগের জবাবে বিশ্বনাথবাবু বলেন, “সেই সময় বহু মানুষ নিজেই এখানে এসে বসেছিলেন। পরে আস্তে আস্তে পাকা বাড়ি হয়েছে।”

এই বাঁধেরই নদীর দিকে বাড়ি রয়েছে শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের জন উদ্যোগ ও জনস্বাস্থ্য বিভাগের ইন-চার্জ নীহার সরকারের। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁরাই বলেন, একজন সরকারি অফিসার এখানে বাড়ি করেছেন। আগে সেটা দেখুন। আমরা এখানে ৩০-৩৫ বছর ধরে বসবাস করছি। বিষয়টি নিযে নীহার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শুধু আমি নই, বহু মানুষই এখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন। আমি এখন সরকারি চাকরি করি ঠিকই, কিন্তু আগে আমরাও শ্রমিক হিসাবে কাজ করে সংসার চালাতাম। সেই সময় আমরা কোনোরকমে এখানে একটা ঘর করে বসবাস শুরু করি। আমাদের জমির কোনো কাগজপত্র নেই।